স্পেনে কর্মরত লাখো মানুষের জন্য নতুন বছরে বাড়ল আর্থিক চাপ। ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে দেশটির সোশ্যাল সিকিউরিটি ব্যবস্থায় কার্যকর হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মীদের বেতন ও নিয়োগকর্তাদের ব্যয়ের ওপর। পেনশন সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার যে নতুন অবদান কাঠামো চালু করছে, তাতে বিশেষ করে উচ্চ আয়ের কর্মীদের সোশ্যাল সিকিউরিটি চাঁদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। সরকার বলছে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে মূলত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কম জন্মহার এবং ভবিষ্যৎ পেনশন ব্যবস্থার টেকসইতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। তবে কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সংস্কারের কারণ
স্পেন ইউরোপের অন্যতম দ্রুত বয়স্ক হয়ে যাওয়া মানুষের দেশ। মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, কিন্তু জন্মহার কমছে। এর ফলে, অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কর্মক্ষম মানুষের অনুপাতে পেনশনভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে পেনশন তহবিলে ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সরকার মনে করছে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী দশকগুলোতে পেনশন ব্যবস্থা বড় সংকটে পড়তে পারে। তাই পেনশন রিজার্ভ ফান্ড শক্তিশালী করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিশ্চয়তা দিতে সোশ্যাল সিকিউরিটি চাঁদা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
যেসব বড় পরিবর্তন আসছে
এই সংস্কার মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলো হলো, ইন্টারজেনারেশনাল ইকুইটি মেকানিজম বৃদ্ধি, উচ্চ আয়ের কর্মীদের জন্য সলিডারিটি কন্ট্রিবিউশন ও সর্বোচ্চ চাঁদা নির্ধারণের সীমা পুনর্মূল্যায়ন। এই তিনটি পদক্ষেপ একসঙ্গে কার্যকর হলে সোশ্যাল সিকিউরিটি তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ জমা হবে বলে সরকারের ধারণা।
ইন্টারজেনারেশনাল ইকুইটি মেকানিজম (আইইএম)
আইইএম-হলো বেতনের ওপর আরোপিত একটি অতিরিক্ত সোশ্যাল সিকিউরিটি চার্জ, যা এই সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৫ সালে এ হার ছিল, ০.৮০ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে বাড়িয়ে করা হচ্ছে, ০.৯০ শতাংশ। বেতনভুক্ত কর্মীদের ক্ষেত্রে, নিয়োগকর্তা দেবেন, ০.৭৫ শতাংশ আর কর্মী দেবেন, ০.১৫ শতাংশ। স্বনিয়োজিত কর্মীদের ক্ষেত্রে, পুরো ০.৯০ শতাংশ নিজেকেই বহন করতে হবে অর্থাৎ, বেতনভুক্ত কর্মীদের ওপর সরাসরি চাপ তুলনামূলক কম হলেও স্বনিয়োজিতদের জন্য এটি একটি বড় অতিরিক্ত বোঝা।
আইইএম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
আইইএম-কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। হার বৃদ্ধির সময়সূচি, ২০২৩ সালে ০.৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে ০.৭ শতাংশ, ২০২৫ সালে ০.৮ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ০.৯ শতাশ। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩২ সালে এই হার ১.২ শতাংশে গিয়ে স্থিতিশীল হবে। এই ব্যবস্থা চালু করা হয় আগের দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা সূচক বাতিল করে, যাতে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন ব্যবস্থার আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
সংহতি ভিত্তিক চাঁদা
এই সংস্কারের আরেকটি বড় দিক হলো সংহতি ভিত্তিক চাঁদা। যেসব বেতনভুক্ত কর্মীর আয় সর্বোচ্চ চাঁদা সীমার বেশি।২০২৫ সালে সর্বোচ্চ মাসিক চাঁদা সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, মাসিক ৫,১০১.২০ ইউরো ও বাৎসরিক ৬১,২১৪.৪০ ইউরো। এছাড়া আয়ের ওপর ভিত্তি করে চাঁদার হার, সর্বোচ্চ সীমার ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি আয়: ১.১৫ শতাংশ, ১০–৫০ শতাংশ বেশি আয়: ১.২৫ শতাংশ এবং৫০ শতাংশের বেশি আয়: ১.৪৬ শতাংশ। এ বিষয়ে সরকারের যুক্তি খুব স্পষ্ট, যার আয় বেশি, তার দায়ও বেশি। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সলিডারিটি কন্ট্রিবিউশন স্বনিয়োজিত কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব
এই সংস্কারের ফলে, কর্মীদের জন্য হাতে পাওয়া নেট বেতন কমে যেতে পারে, বিশেষ করে উচ্চ আয়ের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য, নিয়োগকর্তাদের শ্রম ব্যয় বাড়বে এবং নতুন নিয়োগ ও বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে।
সমালোচনা ও সরকারের অবস্থান
সমালোচকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কর্মজীবী শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে এটি ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে সরকার বলছে, আজ কিছুটা ত্যাগ না করলে, আগামী দিনে পেনশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৬ সালের এই সোশ্যাল সিকিউরিটি সংস্কার স্পেনের পেনশন ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি একদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পেনশন সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে বর্তমান কর্মজীবীদের জন্য তৈরি করছে বাড়তি আর্থিক চাপ।
নতুন বছর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পেনের লাখো কর্মী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাস্তব অর্থেই টের পাবে, এই সংস্কারের প্রভাব কতটা গভীর।
