ইতালির ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি’র নেতৃত্বাধীন সরকারের বিশেষ প্রশাসনিক উদ্যোগের সুফল মিলতে শুরু করেছে নাগরিক সেবায়। এর অন্যতম বড় উদাহরণ, ইতালিয়ান পাসপোর্ট ইস্যু প্রক্রিয়ার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া। চলতি বছরের মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ে দেশটিতে ইস্যু করা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার নতুন পাসপোর্ট। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ মোট ২২ লাখের বেশি নতুন পাসপোর্ট ইস্যু হতে পারে। এই খবরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন ইতালিতে বসবাসরত হাজারো অভিবাসী ও প্রবাসী, বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটি।
প্রশাসনিক জট কাটাতে সরকারের বিশেষ কর্মসূচি
দীর্ঘদিন ধরেই ইতালিতে পাসপোর্ট নবায়ন ও নতুন পাসপোর্ট ইস্যু ছিল ধীরগতির একটি প্রক্রিয়া। অনেক ক্ষেত্রে আবেদন জমা দেওয়ার পর মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো। এই পরিস্থিতি বদলাতে ক্ষমতায় এসে মেলোনি সরকার। পাসপোর্ট অফিসে জনবল বৃদ্ধি, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম উন্নতকরণ, পুলিশ সদর দপ্তর ও ডাক বিভাগের মধ্যে সমন্বয় এবং জরুরি ও বিশেষ আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনাসহ একাধিক বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেয়। সরকারের মতে, এই উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সেবা সহজ করা এবং প্রশাসনিক আস্থাহীনতা দূর করা।
শক্তিশালী পাসপোর্ট
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ভ্রমণ নথি হিসেবে পরিচিত ইতালিয়ান পাসপোর্ট। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী, ইতালিয়ান পাসপোর্টধারীরা ভিসা ছাড়াই বা ভিসা অন অ্যারাইভাল সুবিধায় ১৯৪টি দেশে ভ্রমণ করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে, ইউরোপের সব শেঙ্গেন দেশ, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া (ই-ভিসা) এবং লাতিন আমেরিকার প্রায় সব দেশ। এই সুযোগ ইতালিয়ান নাগরিকদের জন্য যেমন আন্তর্জাতিক যাতায়াত সহজ করে, তেমনি নাগরিকত্বপ্রত্যাশীদের জন্য এটি এক বিশাল প্রণোদনা।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আশার আলো
ইতালিতে বর্তমানে প্রায় দুই লাখের কাছাকাছি বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করছেন বলে বিভিন্ন অভিবাসন পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে। তাদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে, স্থায়ী বসবাসের অনুমতি, দীর্ঘমেয়াদি রেসিডেন্স এবং শেষ পর্যন্ত ইতালিয়ান নাগরিকত্ব পাওয়ার লক্ষ্যে অপেক্ষায় আছেন। পাসপোর্ট ইস্যু প্রক্রিয়া দ্রুত হওয়ায় নাগরিকত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশিরা এখন তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যেই পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন, যা আগে অনেক ক্ষেত্রে এক বছরেরও বেশি সময় লাগত। রোমে বসবাসরত এক বাংলাদেশি নাগরিকত্বপ্রাপ্ত প্রবাসী বলেন…
আগে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর পাসপোর্ট পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হতো। এখন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পাসপোর্ট হাতে পাওয়া যাচ্ছে, এটা আমাদের জন্য বড় স্বস্তি।
নাগরিকত্ব আবেদনেও বাড়তি আগ্রহ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাসপোর্ট ইস্যু দ্রুত হওয়ায় এখন আরও বেশি অভিবাসী নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে উৎসাহিত হচ্ছেন। কারণ, নাগরিকত্ব পাওয়ার পর বাস্তব সুফল দ্রুত মিলছে, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক হিসেবে অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের বাংলাদেশিরা ইউরোপের ভেতরে পড়াশোনা, চাকরি ও ব্যবসার সুযোগ কাজে লাগাতে আগ্রহী হচ্ছেন।
সরকারের বক্তব্য
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাসপোর্ট ইস্যু একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। আমরা চাই নাগরিকরা অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও বিলম্ব ছাড়াই এই সেবা পান। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে…
ভবিষ্যতে ডিজিটাল সেবা আরও বিস্তৃত করে পুরো প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
জর্জা মেলোনি সরকারের এই উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক সাফল্য নয়, বরং এটি ইতালিতে বসবাসরত অভিবাসী ও নতুন নাগরিকদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনে দিয়েছে। দ্রুত পাসপোর্ট ইস্যুর ফলে আন্তর্জাতিক চলাচল সহজ হচ্ছে, বাড়ছে আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সুযোগ।
বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে একটি বড় আশার খবর, যা তাদের ইউরোপীয় স্বপ্নকে আরও এক ধাপ কাছে নিয়ে এসেছে।
