সোমবার, ১৭ই আগস্ট, ২০২৬   |   ২রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমুদ্রপথে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় প্রবেশের পর কয়েক হাজার অভিবাসী সেখানে আটকা পড়েছেন। বর্তমানে শহরের এল ত্রামপোলিন সৈকত ও উপকণ্ঠে মানবেতর পরিবেশে দিন কাটছে তাদের। মরক্কোয় ফেরত না পাঠিয়ে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার সুযোগ ও আশ্রয়ের দাবিতে রোববার বিক্ষোভ করেছেন তাদের অনেকে। আটকে পড়াদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন।

তাদের একজন ৩৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইসমাইল হোসাইন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ছাড়েন তিনি। এরপর ভারত, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, মিসর, লিবিয়া ও আলজেরিয়া হয়ে ইউরোপের পথে এগিয়ে যান। দীর্ঘ এই যাত্রার বড় অংশই তিনি হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন। পথে মরুভূমিতে তৃষ্ণায় সহযাত্রীদের মৃত্যুও দেখেছেন তিনি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, দুই সপ্তাহ আগে সেউতার সীমান্তে অভিবাসীদের ব্যাপক ঢলের পর সেখানে ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার মানুষ আটকা পড়েন। ওই সময় প্রায় ৭২ হাজার মানুষ মাত্র ৮০ হাজার জনসংখ্যার ছোট এই ভূখণ্ডে ঢোকার চেষ্টা করেন। পরে কয়েক দিনের মধ্যে তাদের বড় একটি অংশ স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে গেলেও হাজারো মানুষ সেউতায় রয়ে যান।

রোববার এল ত্রামপোলিন সৈকতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অভিবাসীদের হাতে ছিল স্পেনের পতাকা ও বিভিন্ন ব্যানার। সেগুলোতে লেখা ছিল, ‘আমরা মরক্কোয় ফিরে যেতে চাই না’ এবং ‘আমরাও মানুষ’। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দেন, ‘আমরা ক্লান্ত’ ও ‘আমাদের একটি সমাধান দরকার।’

মরক্কোর তেতোয়ান শহরের বাসিন্দা আয়ুব এলারুদ বলেন, তারা সমুদ্রের পাশে ঠান্ডা ও দুর্গন্ধের মধ্যে ঘুমাচ্ছেন। তার অভিযোগ, পুলিশ তাদের শহরের কেন্দ্রের দিকে যেতে দিচ্ছে না।

তবে স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা জানিয়েছেন, অনিয়মিতভাবে সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের সেখানে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে না। তাদের স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার সুযোগ বা বৈধ মর্যাদাও দেওয়া হবে না। তবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিশেষভাবে অসহায় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে।

এদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে সেউতার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে। স্থানীয় মেডিকেল বোর্ডের প্রধান এনরিকে রোভিরাল্তা বলেন, সীমিত সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী প্রচণ্ড চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। সংক্রামক ডায়রিয়া ও খোসপাঁচড়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি মারামারি ও সহিংসতার ঘটনায় নাক ভেঙে যাওয়া কিংবা ছুরিকাঘাতের মতো আঘাতও বাড়ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট ধীর বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সেউতায় থাকা অভিবাসীদের সবার ইউরোপে আসার কারণ এক নয়। মরক্কোর অনেকে খারাপ কর্মপরিবেশ ও কম আয়ের কারণে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের অনেকের উচ্চতর শিক্ষা ও পেশাগত যোগ্যতাও রয়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধ, অপহরণ ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে আশ্রয়ের সন্ধানে আসা মানুষও রয়েছেন।

উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ার সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ৩০ বছর বয়সী ইলেকট্রিশিয়ান ইমানুয়েল জানান, সন্তানদের অপহরণের আশঙ্কায় তারা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই নাইজার, আলজেরিয়া ও মরক্কো হয়ে চার মাসের বিপজ্জনক যাত্রা শুরু করেন তিনি।

দক্ষিণ সেনেগালের বাসিন্দা ওসমানও আশ্রয়ের আশায় সেউতায় রয়েছেন। যৌন পরিচয়ের কারণে নিজ দেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসার কথা জানিয়েছেন তিনি। স্থানীয় কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেও এখনো কোনো সাড়া পাননি।

সব মিলিয়ে সেউতায় আটকে পড়া অভিবাসীদের পরিস্থিতি স্পেনের সামনে একসঙ্গে মানবিক, রাজনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version