বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্পেনে অনিয়মিত অবস্থায় বসবাসরত পাঁচ লাখের বেশি অভিবাসীকে নিয়মিতকরণের ঘোষণায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসা হাজারো অভিবাসী এখন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ ও আবেদন প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আগামী এপ্রিল মাস থেকে এই ঐতিহাসিক রয়্যাল ডিক্রির অধীনে নিয়মিতকরণের আবেদন গ্রহণ শুরু হবে।

গত ২৭ জানুয়ারি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট জোট সরকার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে একটি যুগান্তকারী রয়্যাল ডিক্রি অনুমোদন দেয়। এই ডিক্রির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা অভিবাসীদের একটি বড় অংশকে বৈধতার আওতায় আনার পথ খুলে যায়। ইউরোপের সাম্প্রতিক অভিবাসন বাস্তবতায় এমন উদ্যোগ খুবই বিরল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইউরোপের কঠোর অভিবাসন নীতির বিপরীতে স্পেন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি বেড়েছে। ইতালি, ফ্রান্স ও গ্রিসে সীমিত আকারে নিয়মিতকরণের উদ্যোগ দেখা গেলেও সেগুলো কঠোর শর্ত ও নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক ছিল। সর্বশেষ পর্তুগালেও নতুন নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে যান।

এই প্রেক্ষাপটে স্পেনের সিদ্ধান্তকে অনেকেই ইউরোপীয় অভিবাসন নীতিতে একটি ব্যতিক্রমী ও মানবিক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। তবে এই সিদ্ধান্ত ডানপন্থি ও কট্টর অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা

সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, স্পেন ‘মর্যাদা, সহমর্মিতা ও ন্যায়ের’ পথেই এগোচ্ছে। গত সপ্তাহান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ৪৬ সেকেন্ডের এক ভিডিও বার্তায় ইংরেজিতে তিনি বলেন, কেউ কেউ বলছেন, আমরা স্রোতের বিপরীতে যাচ্ছি। কিন্তু অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া কবে থেকে চরমপন্থা হয়ে গেল? আর সহানুভূতি কবে থেকে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো?

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ডিক্রির লক্ষ্য হলো, যেসব মানুষ ইতোমধ্যে স্পেনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল ও আইনি বসবাসের পথ তৈরি করা। সানচেজ আরও বলেন, এই মানুষগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তারা বাজারে যায়, গণপরিবহণ ব্যবহার করে, স্কুলে আসে, আমাদের বাবা-মায়ের দেখভাল করে, মাঠে কাজ করে এবং দেশের অগ্রগতিতে আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভূমিকা রাখে।

নাগরিক উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত

এই নিয়মিতকরণ প্রস্তাবের পেছনে ছিল একটি বড় নাগরিক উদ্যোগ। এতে সাত লাখের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেন। ক্যাথলিক চার্চের একটি বড় অংশ এবং প্রায় ৯০০ সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন এই উদ্যোগে সমর্থন জানায়। ২০২৪ সালে সংসদে উত্থাপনের পর এটি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকলেও সম্প্রতি বামপন্থি পোদেমোস দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে পরিকল্পনাটি অনুমোদনের পথে এগোয়।

ভিডিও বার্তা প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই অভিবাসন ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থানের কারণে সানচেজকে ‘অ্যান্টি-ট্রাম্প’ হিসেবে আখ্যা দেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিস্থিতিও তার অবস্থান নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে।

দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের প্রস্তুতি

স্পেনের এই ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দেখা গেছে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের মধ্যে। পর্তুগালে নিয়মিতকরণের পথ বন্ধ থাকায় গত এক বছরে অনেক অভিবাসী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন। স্পেনের সিদ্ধান্ত তাদের জন্য নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। ইতোমধ্যে বার্সেলোনায় পাকিস্তান কনস্যুলেটের সামনে পাকিস্তানি নাগরিকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। নিয়মিতকরণের আবেদনের জন্য পাসপোর্ট নবায়ন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ নিজ নিজ দেশের নাগরিক নথি সংগ্রহে ব্যস্ত তারা।

এদিকে মাদ্রিদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পরিস্থিতিকে বিশেষ হিসেবে বিবেচনা করে বার্সেলোনা, ভ্যালেন্সিয়া ও অন্যান্য শহরে ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা চালু করেছে। এতে করে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দ্রুত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন। ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার অভিবাসীদের মধ্যেও একই ধরনের প্রস্তুতি ও তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নিয়মিতকরণের আওতায় থাকবেন কারা

সরকারি ডিক্রি অনুযায়ী, নিয়মিতকরণের আওতায় আসতে হলে আবেদনকারীদের কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে, আবেদনকারীকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর আগে স্পেনে প্রবেশ করতে হবে, আবেদনের সময় টানা অন্তত পাঁচ মাস স্পেনে বসবাসের প্রমাণ দেখাতে হবে, স্পেন বা অন্য কোনো দেশে ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড থাকা যাবে না, আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করে বর্তমানে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা আশ্রয়প্রার্থীরাও এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসবেন। এছাড়া যাদের বৈধতা দেওয়া হবে, তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা সরাসরি পাঁচ বছরের রেসিডেন্স পারমিট পাবেন।

প্রতারণার ঝুঁকি ও সতর্কবার্তা

নিয়মিতকরণ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশভিত্তিক বিভিন্ন কমিউনিটি গ্রুপে প্রশ্নোত্তর ও তথ্য বিনিময় বেড়েছে। তবে ভাষাগত দুর্বলতা ও আইনি জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান আইনি সহায়তা ও ভাষা প্রশিক্ষণের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে কমিউনিটি সাংবাদিক নুরুল ওয়াহিদ বলেন, বৈধতা বিষয়ক ডিক্রি জারির পর এক ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীরা এক টাকার কাজের জন্য কয়েক গুণ পর্যন্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। যেখানে একটি বাংলাদেশি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিজে আবেদন করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে এর জন্য ২৫০ ইউরো পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, নতুন করে এখন স্পেনে আসার কোনো সুযোগ নেই। এই নিয়মিতকরণ শুধুমাত্র তাদের জন্য, যারা গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে স্পেনে ছিলেন। এখন কেউ প্রলোভনে পড়ে স্পেনে এলে বৈধতার কোনো সুযোগ পাবেন না।

সচেতনতার উদ্যোগ

এদিকে অনেক অভিবাসী ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকে সচেতনতামূলক ভিডিও ও তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করছেন, যাতে অন্যরা প্রতারণার শিকার না হন। অভিবাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রীয় সেবার সীমাবদ্ধতা ও পর্যাপ্ত এনজিওর অভাবে এই সুযোগে কিছু প্রতিষ্ঠান অভিবাসীদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সঠিক তথ্য, ধৈর্য ও সরকারি চ্যানেলের ওপর নির্ভর করলেই স্পেনের এই নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া হাজারো দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীর জীবনে আইনি নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version