বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

স্পেনের বিলবাও শহরে এক ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৭ বছর বয়সী এক পর্তুগিজ নাগরিক। অভিযোগ উঠেছে, তীব্র ঈর্ষাজনিত কারণে তারই সঙ্গী, ৫৫ বছর বয়সী এক নারী, ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করেন। শুধু তাই নয়, হত্যার সময় ওই নারীর হাতে নিহত ব্যক্তির যৌনাঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয় বলেও জানিয়েছে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য মিরর এবং স্পেনের প্রভাবশালী পত্রিকা এল পাইসএর তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) সকালে বিলবাওয়ের উরিবার্রি এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে এই ঘটনা ঘটে। সেখানে নিহত ব্যক্তি লুইস এম. তার সঙ্গী মারিয়া এবং মারিয়ার দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার নাগরিক মারিয়া হঠাৎ করে এক ঈর্ষাজনিত মানসিক উত্তেজনায় তার সঙ্গীর ওপর হামলা চালান। রান্নাঘরের ছুরি দিয়ে তিনি একের পর এক আঘাত করেন লুইসের শরীরের বিভিন্ন অংশে। পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের শরীরে গলা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। একটি আঘাতে তার যৌনাঙ্গ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে লুইসের মরদেহ উদ্ধার করে এবং মারিয়াকে সেখানেই আটক করে। অভিযুক্ত নারী শুরুতেই অপরাধ স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে এল পাইস।

হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রথম পুলিশকে জানায় মারিয়ার এক মেয়ে, যিনি বয়সে বিশের কোঠায়। তিনি মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে পুলিশকে শুধু বলতে পেরেছিলেন, আমার মা আমার বাবাকে হত্যা করেছে। পুলিশ জানায়, মেয়েটির সঙ্গে তার সৎ বাবার সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ।

হামলার সময় নিহত ব্যক্তি আত্মরক্ষার চেষ্টা করায় অভিযুক্ত নারীও সামান্য আঘাত পান। ফলে তাকে প্রথমে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে প্রাথমিকভাবে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় হত্যা মামলা রুজু হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।

স্প্যানিশ গণমাধ্যম জানায়, লুইস ও মারিয়ার মধ্যে প্রায় পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আগে কোনো পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ বা পুলিশি রেকর্ড ছিল না। এই তথ্যই ঘটনাটিকে আরও বিস্ময়কর করে তুলেছে।

নিহত লুইস এম. দীর্ঘদিন ধরে বিলবাওয়ে বসবাস করছিলেন। তিনি স্থানীয় একটি বারের মালিক ছিলেন এবং এলাকায় পরিচিত মুখ ছিলেন। তার তিন সন্তান ও একাধিক নাতি-নাতনি রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।

দম্পতির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও একটি বেকারির মালিক লেইদি এল ডিয়ারিও বাস্কোকে বলেন, আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। তারা স্বাভাবিকভাবেই একসঙ্গে সময় কাটাতেন, হাসতেন, কথা বলতেন। এমন কিছু ঘটতে পারে, তা কখনো ভাবিনি।

একজন স্থানীয় ট্যাক্সিচালক বলেন, বাইরে থেকে তাদের একেবারে স্বাভাবিক দম্পতি মনে হতো। কিন্তু মানুষের ঘরের ভেতরে কী ঘটে, তা কেউ জানে না। এই ঘটনা পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপে পারিবারিক বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সহিংসতা অনেক সময় পূর্বলক্ষণ ছাড়াই ভয়াবহ রূপ নেয়। দীর্ঘদিন কোনো অভিযোগ না থাকলেও মানসিক চাপ, ঈর্ষা, নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা কিংবা গোপন দ্বন্দ্ব হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে মারাত্মক অপরাধে রূপ নিতে পারে। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি ইউরোপজুড়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর হাতে সংঘটিত সহিংস অপরাধের একটি ভয়ংকর উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

বিলবাওয়ের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাভাবিক দেখানো সম্পর্কের আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়াবহ বিপদ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন তদন্ত করছে, তবে একটি জীবন আর ফিরে আসবে না। পুরো কমিউনিটি এখনো প্রশ্ন করছে, কীভাবে এমন একটি সম্পর্ক এত নৃশংস পরিণতির দিকে গড়াল?

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version