সোমবার, ৩রা আগস্ট, ২০২৬   |   ১৯ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের দেশটিতে কাজের অনুমতি পেতে ১ লাখ ডলার ফি দিতে হতে পারে—এমন একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বৈধ অভিবাসন সীমিত করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির আরও একটি ধাপ এগিয়ে যাবে। একই সঙ্গে এটি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও বড় ধাক্কা হতে পারে, কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা। এছাড়া প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সিলিকন ভ্যালি ও ওয়াল স্ট্রিটের কোম্পানিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ তারা প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশেষায়িত পদে বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ দিয়ে থাকে।

প্রস্তাবিত ফিটি ‘অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং’ (ওপিটি) কর্মসূচির ওপর আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার পর স্টুডেন্ট ভিসার অধীনেই এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার সুযোগ পান। ২০২৪ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সে বছর প্রায় ৪ লাখ ১৯ হাজার বিদেশি ওপিটি কর্মসূচির আওতায় কর্মরত ছিলেন।

এই পরিকল্পনা মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের আগের একটি উদ্যোগের ধারাবাহিকতা। এর আগে বিদেশি পেশাজীবীদের জন্য এইচ-১বি ভিসার ওপর ১ লাখ ডলার ফি আরোপের চেষ্টা করা হয়েছিল। গত বছর এ প্রস্তাব প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও গত সপ্তাহে বোস্টনের একটি আপিল আদালত সরকারকে এইচ-১বি ফি আদায় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়।

প্রশাসনের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল সব ধরনের এইচ-১বি ভিসার ওপর এই ফি আরোপ করা। তবে প্রযুক্তি খাতের প্রবল আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত এটি কেবল বিদেশ থেকে নতুন করে আসা কর্মীদের ক্ষেত্রে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাধারণত এ ধরনের কর্মীরা আইটি ও অ্যাকাউন্টিং প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন।

অন্যদিকে প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ করে এবং কয়েক বছর পর তাদের স্টুডেন্ট ভিসা থেকে এইচ-১বি ভিসায় স্থানান্তর করে। ফলে ওপিটির ওপর প্রস্তাবিত ১ লাখ ডলারের ফি কার্যত এসব প্রতিষ্ঠানের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)-এর এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কোনো নীতিকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার অখণ্ডতা রক্ষায় কীভাবে বিদ্যমান বিভিন্ন নীতিগত উপায় ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে বিভাগটি নিয়মিত আলোচনা করে।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন কর্মকর্তাদের নীতিগত আলোচনায় ১ লাখ ডলারের ফি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। কম আয়ের বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিরুৎসাহিত করতে তারা ধারাবাহিকভাবে নতুন প্রস্তাব তৈরি করছেন। এইচ-১বি ও স্টুডেন্ট ভিসার পাশাপাশি স্টেট ডিপার্টমেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের কাছ থেকেও ১ লাখ ডলারের বন্ড বা জামানত নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। নাগরিকত্ব পাওয়ার পরই কেবল সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওপিটির ওপর ১ লাখ ডলারের ফি আরোপের প্রস্তাবটি এখনও ডিএইচএসের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় রয়েছে। হোয়াইট হাউস এটি অনুমোদন করবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এছাড়া এই অর্থ শিক্ষার্থীদের, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাকি নিয়োগকর্তার দিতে হবে—সে বিষয়েও এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ওপিটি সম্পর্কিত আরেকটি নতুন নিয়ম ঘোষণা করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ওপিটি সুবিধা নিতে চাইলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আলাদা আবেদন করতে হবে। আগে স্টুডেন্ট ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পড়াশোনার সময়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত তিন বছর পর্যন্ত কাজের অনুমোদনের জন্য বৈধ থাকত।

ডিএইচএস বর্তমানে ওপিটি কর্মসূচির পুরো কাঠামো পুনর্লিখনের জন্য একটি বড় আকারের প্রবিধান তৈরির কাজ করছে। এটি চলতি শরৎকালেই প্রকাশ করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে ওপিটি দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম বড় আকর্ষণ। অভিবাসনপন্থীদের মতে, এই কর্মসূচি না থাকলে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হবেন। এতে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত দক্ষতার সুফল অন্য দেশের শ্রমবাজার পাবে।

অন্যদিকে অভিবাসনবিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরেই ওপিটি কর্মসূচির সমালোচনা করে আসছেন। তাদের দাবি, এই কর্মসূচির মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সহজেই বিদেশি গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ দিতে পারে এবং এতে মার্কিন গ্র্যাজুয়েটদের তুলনায় বিদেশিদের কম বেতন দেওয়া হচ্ছে কি না, তা কার্যকরভাবে তদারকির সুযোগ থাকে না।

প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় স্টিফেন মিলারসহ কয়েকজন শীর্ষ অভিবাসন কর্মকর্তা ‘স্টেম ওপিটি’ কর্মসূচি বাতিলের পক্ষে ছিলেন। এই কর্মসূচির আওতায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) বিষয়ে স্নাতকরা তিন বছর পর্যন্ত কাজ করার সুযোগ পান। তবে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারসহ প্রশাসনের ব্যবসাবান্ধব অংশের বিরোধিতার কারণে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version