বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্যে অবৈধ অভিবাসন বাণিজ্যের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ফাঁস হয়েছে, যেখানে ফেসবুককে ব্যবহার করে প্রকাশ্যেই ওয়ার্ক ভিসা কেনাবেচা করা হচ্ছিল। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী কোমল শিন্ডে। গোপন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তিনি মাত্র ১২ হাজার  থেকে ১৯ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যের স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা বিক্রি করতেন।

ডেইলি মেইলের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোমল শিন্ডে পরিচালনা করেন ‘ক্রিশিভ কনসালটেন্সি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া চাকরি, জাল কাগজপত্র, মিথ্যা অভিজ্ঞতার সনদ এবং নকল বেতন রেকর্ড তৈরি করে অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে অবস্থানের সুযোগ করে দিত। এসব কার্যক্রম তিনি কোনো সরকারি লাইসেন্স বা বৈধ অভিবাসন পরামর্শকের অনুমোদন ছাড়াই চালাচ্ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।

তদন্তে দেখা গেছে, ফেসবুক মার্কেটপ্লেস ও বিভিন্ন গ্রুপে অনিয়ন্ত্রিত দালালরা প্রকাশ্যেই ভিসা-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। সেখানে উচ্চ সফলতার নিশ্চয়তা বা নিশ্চিত অনুমোদন-এর মতো লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিবাসীদের কাছ থেকে হাজার হাজার পাউন্ড আদায় করা হচ্ছিল। এসব ভিসা মূলত বৈধ রুটে আবেদন করা হলেও চাকরিগুলো ছিল কাগুজে, বাস্তবে সেই কাজ করতে হতো না।

গোপন প্রতিবেদকদের সঙ্গে সাক্ষাতে কোমল শিন্ডে দাবি করেন, তিনি নিজে যুক্তরাজ্যে স্টুডেন্ট ভিসায় অবস্থান করছেন। তবে একইসঙ্গে তিনি বলেন…

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, কেয়ার হোম ও গুদামে কাজের নামে স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসা জোগাড় করে দেওয়া সম্ভব।

তার ভাষায়…

চাকরি ছাড়া হলে খরচ পড়বে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার পাউন্ড। আর চাকরিসহ ভিসার ক্ষেত্রে তিনি বলেন, চাকরিসহ হলে খরচ হবে ১৭ হাজার থেকে ১৯ হাজার পাউন্ড, এখন আপনার সিদ্ধান্ত, চাকরিসহ নেবেন, নাকি চাকরি ছাড়া।

তদন্তে আরও জানা যায়, অনেক অভিবাসীকে বলা হতো, তাদের বাস্তবে কোনো কাজ করতে হবে না। কেবল কাগজে-কলমে চাকরি দেখানো হবে। স্পনসর নিয়োগকর্তা প্রতি মাসে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতন পাঠাবে, এরপর সেই টাকা সঙ্গে সঙ্গে নগদে ফিরিয়ে নিতে হবে। এই ভুয়া বেতনচক্রের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের হোম অফিসকে বোঝানো হতো যে চাকরিটি বৈধ ও সক্রিয়।

শিন্ডে দাবি করেন, প্রতিটি ভিসা ব্যবস্থার জন্য তিনি ১ হাজার পাউন্ড কমিশন নিতেন। বাকি অর্থ যেত সংশ্লিষ্ট স্পনসর নিয়োগকর্তাদের কাছে। তিনি বারবার সতর্ক করে বলেন…

পুরো প্রক্রিয়ায় গোপনীয়তা বজায় রাখা জরুরি, কারণ কিছু “লিক” হলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে।

স্কিল্ড ওয়ার্কার ভিসার পাশাপাশি শিন্ডে গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন। এই ভিসা সাধারণত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা বা শিল্পকলায় ব্যতিক্রমী দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত। তবে শিন্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, এই রুটেও নাকি সব ম্যানেজ করা সম্ভব, মূল্য সর্বোচ্চ ৩০ হাজার পাউন্ড। তিনি বলেন…

আপনার একটা বিশেষ দক্ষতা আছে, তারা আপনার সব প্রতিভার সার্টিফিকেট বানাবে, অভিজ্ঞতার চিঠি তৈরি করবে, সবই জেনুইন।

শিন্ডে আরও দাবি করেন, তার মাধ্যমে আগের ৭–৮টি আবেদন সফল হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনে হোম অফিসের ইন্টারভিউয়ের জন্য কোচিং দেওয়া হয়, এবং সম্ভব হলে ইন্টারভিউ এড়ানোর ব্যবস্থাও করা হয়। তার কথায়…

সবচেয়ে ভালো হলে আমরা চেষ্টা করব যেন আপনাকে ইন্টারভিউ দিতেই না হয়।

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস জানিয়েছে, অভিযোগগুলো তারা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়…

অভিবাসন জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা হবে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কোমল শিন্ডে। তার দাবি…

আমি কোনো ভিসা বিক্রি করছি না, কোনো কমিশনও নিচ্ছি না। আমি শুধু ওই ব্যক্তির যোগাযোগ নম্বর দিই, যিনি এসব দেখেন, এর বেশি কিছু না।

ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটা জানিয়েছে, তদন্তে চিহ্নিত কনটেন্ট তারা সরিয়ে দিয়েছে এবং নীতিমালা ভঙ্গকারী সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনায় যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ব্যবস্থার নিরাপত্তা, সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার এবং ভিসা জালিয়াতির গভীরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের অগ্রগতির দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছে পুরো অভিবাসন সংশ্লিষ্ট মহল।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version