বুধবার, ১৪ই অক্টোবর, ২০২৬   |   ২৯ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্য সরকারের কঠোর ভিসা নীতির কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির লাইসেন্স হারানোর আশঙ্কায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের দেওয়া ভর্তির অফার বাতিল করছে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যের স্টুডেন্ট ভিসার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ আবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (হোম অফিস) তথ্য বিশ্লেষণ করে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হার বেড়ে ৪০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৩ শতাংশ। বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

নাইজেরীয় শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ হার ছিল ২২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি ও স্পন্সর করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পন্সর করা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনের ৫ শতাংশের বেশি প্রত্যাখ্যাত হলে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। আগে এ সীমা ছিল ১০ শতাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার আকস্মিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকি এড়াতে তারা আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষার্থীদের ভর্তির অফার বাতিল করছে। এর ফলে ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হারও বাড়ছে।

বিদেশি শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তির অফার পাওয়ার পরই স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরে সেই অফার প্রত্যাহার করলে সংশ্লিষ্ট ভিসার আবেদনও প্রত্যাহার করতে হয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে, ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণকারী সংস্থা এনরোলির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত ৫ শতাংশ সীমা ছাড়িয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির লাইসেন্স হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, স্টুডেন্ট ভিসার অপব্যবহার ঠেকানোই কঠোর নীতির মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে, শিক্ষার্থী ভিসায় দেশটিতে প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করা কিংবা অবৈধ কাজে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সরকার।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে ভিসা প্রত্যাখ্যানের পেছনে যুক্তিসংগত কারণ নেই। কোনো কোনো শিক্ষার্থী আগে অন্য দেশে পড়াশোনার কথা বিবেচনা করেছিলেন বলে তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আবার পিএইচডির কিছু আবেদনকারীকে কোর্সের নির্দিষ্ট বিষয় বা মডিউল সম্পর্কে যথেষ্ট ব্যাখ্যা দিতে না পারার কারণে ভিসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিভার্সিটিজ ইউকে ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক জেমি অ্যারোস্মিথ বলেন, অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর আস্থা বজায় রাখা জরুরি। তবে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, অনেক ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যানের পেছনে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ও অসংগতিপূর্ণ যুক্তি। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যাপক হারে ভর্তির অফার বাতিল করতে হচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার উপ-উপাচার্য অধ্যাপক স্টিভেন ম্যাকগুয়াইরের মতে, এই নীতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চীন ও ভারতের শিক্ষার্থীদের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। কারণ, এসব দেশের শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার তুলনামূলক কম।

ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের উপাচার্য অধ্যাপক জেমস মিলারও ভিসা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, কিছু আবেদন প্রত্যাখ্যানের পেছনে অত্যন্ত দুর্বল ও অযৌক্তিক যুক্তি দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আশ্রয়ের আবেদন করা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা ছাড়া ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বৃদ্ধির বিষয়ে হোম অফিস কোনো বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেয়নি।

এ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সীমার মধ্যে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার রাখতে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version