সোমবার, ৩১শে আগস্ট, ২০২৬   |   ১৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতালির ভেনিসের কাছে একটি বড় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা স্থানীয় মেয়র বন্ধ করে দেওয়ার পর সেখানে বসবাসরত মুসলিম প্রবাসী ও বাংলাদেশি অভিবাসীরা ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন।

ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম ‘ফিনকান্তিয়েরি’ শিপইয়ার্ডের মোট শ্রমিকের প্রায় এক-চতুর্থাংশই বাংলাদেশি প্রবাসী। এছাড়া ভেনিসের বার, ক্যাফে এবং রেস্তোরাঁগুলোতেও বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে বাংলাদেশিরা ধর্মঘট ডাকলে তা ভেনিসের পর্যটন ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে সতর্ক করেছেন প্রবাসীরা।

ভেনিসের মূল ভূখণ্ডের মেস্ত্রে শহরের একটি পুরোনো করাতকলের (স মিল) জায়গায় সাদা দেয়ালের এই দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি নির্মাণ করতে চান প্রবাসীরা। তাঁদের দাবি—স্থানীয় ১০,০০০ মুসলিমের এই সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় ও সুন্দর উপাসনালয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধি প্রিন্স হাওলাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে—সিটি কাউন্সিলের এই হয়রানিতে আমরা ক্লান্ত। তারা যদি আমাদের মসজিদটি নির্মাণ করতে না দেয়, তবে আমরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করব। আর আমরা বাংলাদেশিরা যদি ভেনিস, মেস্ত্রে ও মারঘেরায় ধর্মঘট ডাকি, তবে ফিনকান্তিয়েরি শিপইয়ার্ডের চাকা যেমন থমকে যাবে, তেমনি অচল হয়ে পড়বে এখানকার হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো।’

তবে ভেনিসের নবনির্বাচিত ডানপন্থী মেয়র সিমোন ভেনতুরিনি এই মসজিদ প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করছেন। তিনি দাবি করেছেন—প্রস্তাবিত ৮,০০০ বর্গমিটারের মসজিদটি আয়তনে অত্যন্ত বড়। একই সঙ্গে তিনি ইতালীয় সমাজে বাংলাদেশি প্রবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া বা ‘ইন্টিগ্রেশন’-এর অগ্রগতির ওপর জোর দিয়েছেন।

ইতালীয় সংবাদপত্র ‘কোরিয়েরে দেলা সেরা’-কে মেয়র ভেনতুরিনি বলেন, ‘আমি সবসময় আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে আলোচনার প্রথম শর্ত হলো—আমাদের আগে দেখতে হবে ইতালীয় সমাজে বাংলাদেশি প্রবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত কী অগ্রগতি হয়েছে, যার শুরুটা হওয়া উচিত নারীদের সামাজিক অবস্থান দিয়ে। আমি ইদানীং অনেক বেশি নারীকে সম্পূর্ণ পর্দা বা বোরকা পরা অবস্থায় দেখছি, যা আমাকে উদ্বিগ্ন করে।’

মেয়র আরও দাবি করেন যে, বাংলাদেশি প্রবাসীদের ইতালীয় ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এবং তাঁদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠানোর বিষয়ে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে।

মসজিদ নির্মাণের বিরুদ্ধে মেয়রের এই অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছেন ইতালির কট্টর ডানপন্থী দল ‘দ্য লিগ’-এর প্রধান মাত্তেও সালভিনি। উল্লেখ্য, সালভিনির দল ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ জোটের অন্যতম শরিক। সালভিনি বলেন, ‘আমাদের উচিত ভেনিস এবং ইতালির অন্য যেকোনো স্থানে এই মসজিদের পরিকল্পনাকে সরাসরি না বলা।’

এদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো মেয়রের এই কঠোর অবস্থানকে তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং উগ্র ডানপন্থী নেতা রবার্তো ভানাক্সির ‘ফুতুরো ন্যাজিওনালে’ দলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ঠেকাতেই মেয়র এই কঠোর অভিবাসী-বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। ভেনিসের বামপন্থী নেতা আন্দ্রেয়া মারতেল্লা বলেন, ‘ভানাক্সির ছায়া এখন মেয়রের দরজায় কড়া নাড়ছে।’

প্রস্তাবিত এই মসজিদ নির্মাণ নিয়ে বিতর্কটি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে। বাংলাদেশি কমিউনিটি ইতিমধ্যেই মসজিদ নির্মাণের জন্য জায়গাটি কিনে নিয়েছে, তবে নির্মাণ কাজ শুরু করার আগে তাদের স্থানীয় জোনিং বা ভূমি ব্যবহার নীতিমালার অনুমোদন প্রয়োজন।

এই অনুমোদন পাওয়ার বিষয়ে ভেনিসের সাবেক মেয়র লুইজি ব্রুগনারোর সঙ্গে প্রবাসীদের আলোচনা চলছিল। কিন্তু গত মে মাসে সিমোন ভেনতুরিনি নতুন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর এই আলোচনা সম্পূর্ণ থমকে যায়।

কমিউনিটি নেতা প্রিন্স হাওলাদার জানিয়েছেন, মসজিদ নির্মাণের এই অনুমোদনের জন্য তারা এখন সরাসরি ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লার কাছে আপিল করার পরিকল্পনা করছেন।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দল ‘ব্রাদার্স অব ইতালি’-র প্রতিনিধি রাফায়েল স্পেরানজা প্রবাসীদের এই শিপইয়ার্ড বন্ধের হুমকিকে সম্পূর্ণ ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে এই অঞ্চলের ইসলামি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘ইসলামিক কমিউনিটি’-র সভাপতি সাদমির আলিওভস্কি পরিস্থিতি শান্ত করার তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘ভেনিস এবং এর আশেপাশের এলাকায় একটি বড় ও সুসংগঠিত মুসলিম সমাজ রয়েছে। আসুন, আমরা সবাই একসাথে বসি এবং একে অপরের কথা শুনি, যাতে একটি শান্তিপূর্ণ ও চমৎকার সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়।’

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version