সোমবার, ৩১শে আগস্ট, ২০২৬   |   ১৬ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পর্তুগালের অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত নতুন আইন, যা দেশটিতে ‘ফেরত আইন’ নামে পরিচিত, সেটির আইনি বৈধতা বহাল রেখেছেন দেশটির সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে পর্তুগালের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও জোসে সেগুরো বিলটির ওপর একটি ‘প্রতিরোধমূলক পর্যালোচনার’ জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।

আদালতের এই সবুজ সংকেতের পর বিলটি পুনরায় প্রেসিডেন্টের কার্যালয় বেলেম প্যালেসে পাঠানো হবে। এখন প্রেসিডেন্ট সেগুরো হয় বিলটিতে সই করে একে আইনে রূপান্তর করবেন, অথবা তাঁর বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে রাজনৈতিক ভেটো (বাতিল) দেবেন।

সাংবিধানিক আদালতের সভাপতি জোয়াও কার্লোস লৌরেইরো এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন—সাতজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে বিলটিতে কোনো অসাংবিধানিকতা নেই বলে রায় দিয়েছেন। ১৬০ পৃষ্ঠার দীর্ঘ এই রায়ে প্রেসিডেন্ট সেগুরো উত্থাপিত ১১টি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে, যেখানে মূলত শিশুদের অধিকার এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে প্রেসিডেন্টের গভীর উদ্বেগ ছিল।

বিচারক লৌরেইরো স্পষ্ট করেন যে, পূর্ববর্তী সাধারণ অভিবাসন আইনের বিপরীতে এই নতুন ‘ফেরত আইন’টি মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক’-এর আইনি কাঠামোর অধীনে তৈরি করা হয়েছে। এর আগে আদালত সাধারণ অভিবাসন আইনের যে পাঁচটি ধারা বাতিল করেছিলেন, এবারের ধারাগুলো তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

আদালত তাদের রায়ে নিশ্চিত করেছেন যে, নতুন এই বিলে শিশুদের ‘সর্বোচ্চ স্বার্থ’ রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষাকবচ রয়েছে।

বিলে পর্তুগালে বসবাসরত পর্তুগিজ নাগরিকত্ব পাওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের অভিভাবক বা মা-বাবাকে জোরপূর্বক বহিষ্কারের যে বিধান রাখা হয়েছে, সেটির বিষয়ে বিচারপতিরা একমত হয়েছেন যে—আইনপ্রণেতারা একে ‘স্বয়ংক্রিয় বহিষ্কারের কারণ’ হিসেবে উল্লেখ করেননি। বিলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি ঘটনার পরিস্থিতি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে এবং বিশেষ করে শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ ও পারিবারিক একতা বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

একইভাবে, পর্তুগালের মাটিতে জন্ম নেওয়া পাঁচ বছরের কম বয়সী বিদেশি শিশুদের জোরপূর্বক বহিষ্কার সংক্রান্ত বিধানের ক্ষেত্রে আদালত বলেছেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহিষ্কার করা হবে।’ যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অবশ্যই শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ, পারিবারিক জীবন, স্বাস্থ্যগত অবস্থা, গন্তব্য দেশের পরিবেশ এবং পদক্ষেপের সমানুপাতিকতা খতিয়ে দেখতে হবে।

প্রেসিডেন্ট সেগুরো মূলত তিনটি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন: অবৈধ অভিবাসীদের পর্তুগালের ডিটেনশন সেন্টারে সর্বোচ্চ কতদিন আটকে রাখা যাবে, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের বহিষ্কারের প্রস্তাব এবং আপিল দায়েরের সময়সীমা কমিয়ে আনা। তবে প্রেসিডেন্ট স্বীকার করেছিলেন যে, অবৈধ অভিবাসন রোধ, সীমান্ত সুরক্ষা এবং শেনজেন অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের স্বার্থে এই আইন প্রণয়ন করা জরুরি। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘সীমান্তের নিরাপত্তা কোনোভাবেই মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী হতে পারে না।’

পর্তুগালের ক্ষমতাসীন দল পিএসডি-র সংসদীয় দল মূলত বিতর্কিত এই খসড়া বিলটি তৈরি করেছে। প্রথমে তারা যে ‘রিটার্ন বিল’ এনেছিল, সেখানে অবৈধদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা ও বহিষ্কারের সময়সীমা নিয়ে তীব্র আপত্তি উঠেছিল। পরবর্তীতে পিএসডি সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে ইউরোপীয় ইমিগ্রেশন চুক্তির আদলে এই নতুন খসড়া বিলটি তৈরি করে।

নতুন ‘ফেরত আইনের’ মূল ধারাগুলো:

আটকে রাখার সর্বোচ্চ সময়সীমা: অবৈধভাবে পর্তুগালে প্রবেশ করা যেকোনো ব্যক্তিকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য প্রথমে সর্বোচ্চ ৩৬০ দিন এবং প্রয়োজনে আরও ১৮০ দিন ডিটেনশন সেন্টারে আটকে রাখা যাবে।

আপিলের সময়সীমা হ্রাস: রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যানের পর আপিল করার সময়সীমা অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে।

সরাসরি বহিষ্কার: আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন নাকচ হলে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রবেশাধিকার দেওয়া ছাড়াই সরাসরি সীমান্ত থেকেই অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

বাধ্যতামূলক পরীক্ষা: অবৈধ অভিবাসীদের জন্য বায়োমেট্রিক ডাটা সংগ্রহ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কঠোর নিরাপত্তা স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

সংসদে বিলটি সরকারি দল পিএসডি, সিডিএস এবং লিবারেল ইনিশিয়েটিভের ভোটে পাস হয়। কট্টর ডানপন্থী দল ‘শেগা’ আশ্চর্যজনকভাবে ভোটদানে বিরত ছিল, যদিও প্রেসিডেন্ট যখন বিলটি আদালতে পাঠিয়েছিলেন, তখন শেগাই প্রথম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। আর সংসদের সব বামপন্থী দল এই আইনের বিপক্ষে ভোট দেয়।

রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ক্ষমতাসীন পিএসডি:

দলের মুখপাত্র সেবাস্তিয়াও বুগালহো আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে একে ‘দায়িত্ব পালনের তৃপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে প্রেসিডেন্ট এবার বিলটি অনুমোদন করবেন। তিনি বলেন, ‘যারা নিয়ম মেনে চলবে তারা পর্তুগালে থাকবে; আর যারা নিয়ম ভাঙবে, তারা চলে যাবে।’ প্রেসিডেন্সি বিষয়ক মন্ত্রী আন্তোনিও লেইতাও আমারো এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘এই ফেরত আইন আমাদের প্রশাসনকে অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে বড় ধরনের সহায়তা করবে। আইন ভাঙার পরিণতি ভোগ করতেই হবে।’

বিরোধী দল সোশ্যালিস্ট পার্টি:

সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা হোসে লুইস কার্নেইরো বলেন, তাঁরা আদালতের এই রায়কে সম্মান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে সবসময় সম্মান করি—তাতে আমাদের দ্বিমত বা একমত যাই থাকুক না কেন।’

বামপন্থী ও কমিউনিস্ট দলগুলো:

লিভরে দলের এমপি পাওলো মুয়াচো মনে করেন, আইনি বাধা কাটলেও শিশুদের আটকে রাখা ও বহিষ্কারের অমানবিকতার অজুহাতে প্রেসিডেন্টের এখনও ভেটো দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, পর্তুগিজ কমিউনিস্ট পার্টি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই নতুন আইনের কারণে সাধারণ অভিবাসীদের ওপর অবিচার ও হয়রানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version