ইউরোপের বুকে ভ্রমণের নেশা যাদের আছে, তাদের কাছে প্রতিটি অভিজ্ঞতাই এক নতুন বিস্ময়। গত বছর মার্চে লিসবন থেকে ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম শহর লিওন ভ্রমণে গিয়েছিলাম। চলচ্চিত্রের জন্মভূমি হিসেবে খ্যাত লুমিয়ের ব্রাদার্সের এই শহরটি আমাকে এতটাই টেনেছিল যে, এক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার সুযোগ এলো সেখানে যাওয়ার। তবে এবারের ভ্রমণের মোড় ঘুরিয়ে দিল হুট করে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত, সেটি হলো সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ!
লিওন থেকে জেনেভা
লিওনে বসে বন্ধুদের আড্ডায় হঠাৎ পরিকল্পনা হলো প্রতিবেশী দেশ সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরটি দেখে আসার। শহরটি বাস টার্মিনাল থেকে মাত্র ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটের পথ। আমরা দেরি না করে দ্রুত অনলাইনে ‘ফিলিক্স বাস’-এর টিকিট কাটলাম। শীতকালীন সময় হওয়ায় যাতায়াত খরচও ছিল হাতের নাগালে।
পরদিন ভোর ৬টায় যখন যাত্রা শুরু করি, তখন চারপাশ বৃষ্টির আবহে ধোঁয়াটে। কিন্তু বাসের জানালা দিয়ে যখন সুইজারল্যান্ডের সীমানায় প্রবেশ করলাম, ভোরের সেই কুয়াশা ভেদ করে বেরিয়ে এল প্রকৃতির এক অপার্থিব রূপ। দু’ধারে ঘন বনভূমি, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ আর মেঘে ঢাকা পাহাড়। পাহাড়ের বুক চিরে একের পর এক টানেল পেরিয়ে বাস যখন চলছিল, মনে হচ্ছিল কোনো এক স্বপ্নের দেশে ঢুকে পড়েছি। প্রকৃতিকে ধ্বংস না করে যারা পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব সমাধান খোঁজে এবং পাহাড় না কেটে, বরং পাহাড়ের নিচ দিয়ে টানেল বা বিকল্প পথ তৈরি করে, সুইজারল্যান্ডের সৌন্দর্য আসলে সেই জাতির রুচিরই পরিচয় দেয়।
জেনেভার প্রথম ছোঁয়া
সকাল ১০টায় জেনেভা শহরে ঢোকার মুখে আমাদের রেসিডেন্সি পার্মিট চেক করা হলো। ইউরো জোন হলেও এখানকার নিজস্ব মুদ্রা ‘সুইস ফ্রাঙ্ক’, তবে কেনাকাটায় ইউরো অনায়াসেই চলে। বাস থেকে নেমে প্রথমেই আমরা গেলাম ‘জারদিন আংলাইসে’। বিশাল লেকের পাড়ে ফুলের বাগান আর দূরে পাহাড়ের চূড়ায় জমে থাকা সাদা বরফের দৃশ্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। লেকের মাঝখানে আকাশের দিকে মুখ করে থাকা বিশাল ফোয়ারাটি যেন পর্যটকদের স্বাগত জানাচ্ছিল।
ইতিহাস ও প্রতীকের শহর
শহরের পরিচ্ছন্নতা দেখে যে কেউ অবাক হতে বাধ্য। যানজটহীন ঝকঝকে রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছালাম জাতিসংঘ কার্যালয়ের সামনে। প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের ভিড় জমে এখানে। সেখান থেকে কয়েক কদম দূরেই চোখে পড়ল বিখ্যাত ‘ব্রোকেন চেয়ার’। ৩৯ ফুট উঁচু এই বিশালাকার তিন পায়ের চেয়ারটি ল্যান্ডমাইন বিরোধী অভিযানের এক অনন্য প্রতীক। জেনেভা ভ্রমণে এসে এই স্থাপত্যের সামনে ছবি না তোলাটা যেন অসম্পূর্ণতার নামান্তর।
সিরামিক জাদুঘর
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ‘সুইস মিউজিয়াম অফ সিরামিক এন্ড গ্লাস’ বা এরিয়ানা মিউজিয়াম। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে রাজকীয় কোনো প্রাসাদ। ভেতরে ঢুকতেই সুইস নাগরিকদের আন্তরিক আতিথেয়তা আমাদের মুগ্ধ করল। সবচাইতে বড় সুবিধা হলো, এখানে প্রবেশের জন্য কোনো ফি লাগে না। ১২০০ বছরের পুরনো প্রায় ২০ হাজার সিরামিক ও কাঁচের শিল্পকর্ম সাজানো এই জাদুঘরটি আপনাকে কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে নিয়ে যাবে। ১৭ বা ১৮ শতকের কারুকার্যখচিত সিরামিকের তৈজসপত্রগুলো দেখলে বোঝা যায় কেন বিশ্বজুড়ে এই শিল্পের এত সুনাম।
স্মৃতিময় একদিন ও ডায়েরির পাতা
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির দাপট বাড়ছিল। সন্ধা ৭টার ফিরতি বাসে যখন আবার লিওনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম, তখন মনের ডায়েরিতে জমা হয়েছে একগুচ্ছ অমলিন স্মৃতি। লিওন থেকে আসা-যাওয়া এবং দুপুরের খাবারসহ সারা দিনের এই ভ্রমণে আমাদের দুইজনের খরচ হয়েছে মাত্র ১০৭ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ হাজার টাকা)। সুইজারল্যান্ড মানেই যেন প্রকৃতির রাজকন্যার সাথে দেখা করা। মাত্র ১৫ ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত সফরটি মনে এক শান্ত-শীতল পরশ বুলিয়ে দিয়েছে। ইউরোপের ব্যস্ত জীবনে অল্প খরচে এবং অল্প সময়ে এমন একটি ভ্রমণ ডায়েরির পাতায় আজীবন অম্লান হয়ে থাকবে।
ভ্রমণ টিপস
শুধু জেনেভা নয়, ইউরোপে আন্তঃদেশীয় যেকোনো শহরে ভ্রমণের জন্য ফিলিক্স বাস সাশ্রয়ী এবং আরামদায়ক। আর ভ্রমণের সময় সুইস ফ্রাঙ্ক ও ইউরো দুই-ই সাথে রাখা ভালো। যদিও কার্ড পেমেন্ট সবখানেই সহজ। সেনজেন রেসিডেন্সি পার্মিট থাকলে কোনো অতিরিক্ত ভিসা ছাড়াই অনায়াসে ঘুরে আসা যায় ইউরোপে আন্তঃদেশীয় যেকোনো শহর। তবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরের সিরামিক জাদুঘর ও জাতিসংঘ কার্যালয় দেখার জন্য হাতে কিছুটা সময় নিয়ে যেতে পারলে ভালোভাবে উপভোগ করা যাবে।
