জার্মানিকে তার যন্ত্রণাদায়ক অতীতের সাথে শান্তি স্থাপন করতে শেখানো এবং আধুনিক গণতন্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে দেওয়া প্রখ্যাত দার্শনিক ইয়ুর্গেন হাবারমাস আর নেই। গত ১৪ মার্চ দক্ষিণ জার্মানির স্টার্নবার্গে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব হারাল এমন এক বুদ্ধিজীবীকে, যিনি বিশ্বাস করতেন—অতীতের ভয়াবহতাকে অস্বীকার করে নয়, বরং সততার সাথে তার মোকাবিলা করেই একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি সম্ভব।
১৯২৯ সালে জন্ম নেওয়া হাবারমাস ছিলেন সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা নাৎসিবাদের পতন নিজের চোখে দেখেছিল। জন্মগতভাবে কথা বলায় সামান্য জড়তা থাকলেও, এই শারীরিক সীমাবদ্ধতাই হয়তো তাঁকে আজীবন ‘সংলাপ’ এবং ‘যোগাযোগের’ গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করেছিল। তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের উত্তরসূরি হয়েও পূর্বসূরিদের নৈরাশ্যবাদকে আঁকড়ে ধরেননি; বরং সাধারণ মানুষের উন্মুক্ত বিতর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার স্বপ্ন দেখতেন।
হাবারমাস জার্মানদের নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানের প্রতি অনুগত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর এই ‘সাংবিধানিক দেশপ্রেম’ ধারণাটি জার্মানিকে উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করেছে।তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “The Structural Transformation of the Public Sphere”-এ তিনি দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার বৈধতা কোনো শাসক থেকে নয়, বরং সাধারণ মানুষের অবাধ ও যৌক্তিক বিতর্ক থেকে আসা উচিত।
১৯৮৬ সালের ‘ইতিহাসবিদদের বিতর্কে’ তিনি সেই সব বুদ্ধিজীবীদের কঠোর বিরোধিতা করেছিলেন যারা নাৎসি অপরাধকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। তিনি মনে করতেন, অতীতকে ভুলে যাওয়ার অর্থ হলো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানো।
হাবারমাস কেবল জার্মানিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইউরোপীয় সংহতির প্রবক্তা। ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইউক্রেন ও গাজা সংকট—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে তিনি ন্যায়ের পক্ষে নিজের কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন। তাঁর কান্টীয় নীতিশাস্ত্র ও ব্যবহারিক রাজনীতির সংমিশ্রণ বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
৯৬ বছরের দীর্ঘ জীবনে হাবারমাস শিখিয়ে গেছেন যে, বন্দুকের নল নয়, বরং যুক্তি এবং সংলাপই পারে একটি সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরাতে। তাঁর প্রয়াণে বিশ্ব দর্শনের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল।


