স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপীয় নিরাপত্তার দীর্ঘদিনের ধারণা পাল্টে দিয়ে এক ঐতিহাসিক সামরিক পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েছে জার্মানি। গত ২২শে এপ্রিল জার্মান পার্লামেন্ট বুন্দেসটাগে দেশটির প্রথম একক সামরিক কৌশল ‘রেসপন্সিবিলিটি ফর ইউরোপ’ বা ‘ইউরোপের প্রতি দায়বদ্ধতা’ উপস্থাপন করেছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এতদিন যে জার্মানি তার সামরিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছিল, রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিতিশীল নীতির মুখে তারা এখন সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জার্মানির এই লক্ষ্যমাত্রা কেবল উচ্চাভিলাষীই নয়, বরং ইউরোপের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনের এক শক্তিশালী ইঙ্গিত।
জার্মানির এই নতুন সামরিক কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো ২০৩৯ সালের মধ্যে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত সেনাবাহিনী (Conventional Army) গড়ে তোলা। এই প্রকল্পের আওতায় দেশটি ২০৩৯ সালের মধ্যে ৪ লক্ষ ৬০ হাজার সেনার একটি সম্মিলিত বাহিনী গঠন করবে। চলতি বছরেই প্রতিরক্ষা খাতে ১০৮ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে জিডিপি-র ৩.৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ব্রিটেন বা ফ্রান্সের বর্তমান ব্যয় পরিকল্পনার চেয়েও অনেক বেশি। চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মেজ এই সামরিক আধুনিকায়নকে তাঁর সরকারের প্রধান রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।
তবে জার্মানির এই একক জাতীয় উদ্যোগ ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে, বিশেষ করে ফ্রান্সের সাথে সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। যৌথভাবে পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির প্রকল্প থেকে জার্মানির সরে আসার ইঙ্গিত ২০১৭ সাল থেকে চলে আসা ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সংহতিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যখন জার্মানি এককভাবে তাদের ২০ বছর মেয়াদী কৌশল সাজাচ্ছে, তখন পোল্যান্ড ও ফ্রান্স আলাদাভাবে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যস্ত। পোল্যান্ড ইতোমধ্যেই ২০২৬ সালে তাদের জিডিপি-র ৪.৮ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে, যা দেশটিকে ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপের সবচেয়ে বড় ট্যাঙ্ক বহরের মালিক করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ন্যাটোর ভেতরে যে সমন্বিত ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা এখন ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’র চাপে ফিকে হয়ে আসছে। জার্মানি এখন আর নিছক অর্থনৈতিক শক্তি নয়, বরং ইউরোপের সামরিক ‘নোঙ্গর’ বা চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে চাইছে। তবে এই পথচলা ইউরোপের সম্মিলিত সংহতি বজায় রাখবে নাকি দেশগুলোর মধ্যে সমান্তরাল সামরিক প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: টিভিপি ওয়ার্ল্ড


