শীতের শুরুতেই পর্তুগালের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ-এর নতুন উপধরন এইচথ্রিএনটু কানসাস (H3N2 Kansas) , যা সাধারণ ফ্লুর তুলনায় আরও তীব্র উপসর্গ সৃষ্টি করছে এবং দ্রুত সংক্রমণশীল বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন শ্বাসতন্ত্রজনিত ভাইরাসটি এ বছরের ফ্লু ভ্যাকসিনে অন্তর্ভুক্ত নয়, ফলে এর বিরুদ্ধে সুরক্ষা তুলনামূলকভাবে কম। এই পরিস্থিতি দেশের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা-এসএনএস (SNS)-কে বড় ধরনের প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
কেন এইচথ্রিএনটু কানসাস (H3N2 Kansas) ঝুঁকিপূর্ণ
গত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক ভাইরাস নজরদারি নেটওয়ার্কে জমা হওয়া ইনফ্লুয়েঞ্জা সিকোয়েন্স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে এইচথ্রিএনটু (H3N2) কেসের এক-তৃতীয়াংশই এইচথ্রিএনটু কানসাস (H3N2 Kansas), ইউরোপে এই অনুপাত আরও বেশি, ৫০ শতাংশ-এর কাছাকাছি। পর্তুগালে ইতোমধ্যে কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা বিশেষজ্ঞ ড. মার্তা সিলভা মনে করেন…
এই উপধরন দ্রুত ছড়ায় এবং সংক্রমণের প্রথম ৪৮ ঘণ্টাতেই উপসর্গের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। এমন বৈশিষ্ট্য জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা-এসএনএস (SNS)-এর ওপর তাত্ক্ষণিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ভাইরাসটির বৈশিষ্ট্য
এইচথ্রিএনটু (H3N2) নামটি এসেছে ভাইরাসের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন থেকে। একটি হলো এইচ (H)-হিমাগলুটিনিন টাইপ ৩ আর অন্যটি এন(N)- নিউরামিনিডেস টাইপ ২। এই দুই প্রোটিন ভাইরাসকে মানবকোষে ঢুকতে, বংশবিস্তার করতে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এইচথ্রিএনটু কানসাস (H3N2 Kansas)-এ এমন কিছু মাইনর জেনেটিক শিফট হয়েছে, যা এটিকে দ্রুত বিস্তার এবং তীব্র উপসর্গ সৃষ্টিকারী ভ্যারিয়েন্টে পরিণত করেছে।
উপসর্গ
সাধারণ ফ্লু ধীরে ধীরে বাড়ে, কিন্তু এইচথ্রিএনটু কানসাস (H3N2 Kansas) খুব দ্রুত আঘাত হানে।
অনেক রোগী ‘মরার মতো ব্যথা’, ‘তীব্র দুর্বলতা’ এবং ‘দ্রুত উঁচু জ্বর’-কে সবচেয়ে বড় লক্ষণ হিসেবে জানিয়েছেন।
প্রধান উপসর্গ
- হঠাৎ উচ্চ জ্বর (সাধারণত কাঁপুনিসহ)
- মাথা ও শরীরের তীব্র ব্যথা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- শুকনো কাশি
- গলা ব্যথা
- নাক বন্ধ, সর্দি
- সার্বিক দুর্বলতা
শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উপসর্গ
- বমি
- ডায়রিয়া
- স্বাদ ও ঘ্রাণ হ্রাস
রোগের সাধারণ অগ্রগতি
১ থেকে ৩ দিন তীব্র জ্বর, ব্যথা ও কাশি হয়। ৪ দিনে জ্বর কমে, তবে কাশি বাড়ে, ৫ থেকে ৭ দিনে বেশির ভাগ উপসর্গ কমে যায়, তবে ২ থেকে ৩ সপ্তাহ শুকনো কাশি থেকে যায়।
পর্তুগালের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সতর্কতা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আনা পাউলা মার্টিন্স সতর্ক করে বলেছেন, এই শীত পর্তুগালের জন্য কঠিন হতে পারে। জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা-এসএনএস(SNS)–কে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখতে হবে।
এ বিষয়ে ফুসফুসরোগ বিশেষজ্ঞ ড. লুইস রোচা বলেন…
জরুরি বিভাগে ভিড় বাড়বে, বয়স্ক রোগীদের মধ্যে জটিলতা বাড়বে। প্রয়োজন হলে জরুরি পরিকল্পনা সক্রিয় করতে হবে।
শীত ২০২৪–২৫–এ পর্তুগালে ১৬০০ বেশি মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড হয়েছিল, যার বড় অংশই ৮৫ বছরের বেশি বয়সী নারীদের মধ্যে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে যারা
- ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী
- ৫ বছরের কম বয়সী শিশু
- গর্ভবতী নারী
- ডায়াবেটিস/হৃদরোগ/কিডনি/ফুসফুস রোগী
- ক্যান্সার/ইমিউন–ডিফিশিয়েন্সি রোগী
- স্থূলতা–সম্পন্ন রোগী
প্রতিরোধ
১. ভ্যাকসিন নেওয়া-যদিও এ বছরের ভ্যাকসিনে এইচথ্রিএনটু কে(H3N2 K) অন্তর্ভুক্ত নয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আংশিক সুরক্ষাও জীবন বাঁচাতে পারে।
২. দৈনন্দিন সুরক্ষা অভ্যাস-নিয়মিত হাত ধোয়া, ভিড়ে মাস্ক পরা, চোখ, নাক, মুখ না ছোঁয়া, ঘরের জানালা খোলা রাখা, ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার না করা এবং বারবার স্পর্শকৃত জিনিস পরিষ্কার রাখা।
৩. উপসর্গ দেখা দিলে, ৭ থেকে ১০ দিন ঘরে থাকা, প্রচুর পানি করা, বিশ্রাম নেওয়া ও প্যারাসিটামল/আইবুপ্রোফেন (ডাক্তারের নির্দেশে) খেতে হবে।
বেশি গুরুতর হলে দ্রুত জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা-এসএনএস২৪(SNS 24) ৮০৮২৪২৪২৪–এর সাথেযোগাযোগ করতে হবে।
চিকিৎসা
ওসেলটামিভির (Oseltamivir) কেবল তখনই কার্যকর, যখন সংক্রমণের প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শুরু করা হয়। অনেকেই ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন, যা ভাইরাসসংক্রান্ত রোগে কোনো কাজেই লাগে না।
এইচথ্রিএনটু (H3N2) বনাম কোভিড-১৯ (COVID-19)
এইচথ্রিএনটু (H3N2) ফ্লু হঠাৎ তীব্র জ্বর দিয়ে শুরু হয় কিন্তু কোভিড-১৯ (COVID-19)- এ সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী স্বাদ ও ঘ্রাণ কমে যায়। কোভিড-১৯ (COVID-19)- এ শ্বাসকষ্ট বেশি হয় কিন্তু এইচথ্রিএনটু (H3N2) ফ্লুতে শুরুতেই পেশিব্যথা বেশি হয়। তবে উপসর্গ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না, শুধু পরীক্ষা দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGS) বলছে, পরবর্তী দুই সপ্তাহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ-ভ্যাকসিনের সুরক্ষা কাজ করতে ১৪ দিন লাগে, যদিও সংক্রমণ ইতিমধ্যেই বাড়ছে তাই হাসপাতালগুলোর চাপ বাড়ার আগেই জনগণের সুরক্ষা প্রয়োজন। এ বছর বয়স্কদের মধ্যে ভ্যাকসিনের চাহিদা বেড়েছে, যা ভালো লক্ষণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পর্তুগালের জন্য সতর্কতা
এইচথ্রিএনটু কানসাস (H3N2 Kansas) একটি দ্রুত ছড়ানো ও তীব্র উপসর্গের ফ্লু উপধরন। তবে সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন, সুরক্ষা অভ্যাস, উপসর্গ দেখা দিলে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং দ্রুত চিকিৎসা, এই তিনই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
পর্তুগালের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা-এসএনএস (SNS) ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর জনসচেতনতাই হতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।
