ফুটবলের আন্তর্জাতিক মানচিত্রে এক নতুন রূপকথার জন্ম দিতে যাচ্ছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র কুরাসাও। মাত্র দেড় লাখ জনসংখ্যার এই দেশটির মোট আয়তন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রায় অর্ধেক। আকারে ও জনসংখ্যায় ছোট হলেও ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তাদের স্বপ্ন এখন আকাশছোঁয়া। ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের অধীনে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত খেলে অপরাজিত রয়েছে দলটি। এমনকি বারমুডাকে ৭-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে তারা। একসময় স্প্যানিশরা খনিজ সম্পদ ও মিঠা পানির উৎস না থাকায় কুরাসাওকে ‘আইলা ইনুতিলেস’ বা ‘অকেজো দ্বীপ’ বলে অভিহিত করত। আজও দেশটির মানুষের পানীয় জলের একমাত্র উৎস সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে সরবরাহ করা ব্যবস্থা। অথচ সেই অকেজো দ্বীপের ফুটবলাররাই এখন বিশ্বমঞ্চ কাঁপানোর অপেক্ষায়।
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৬৪৩ সালে ডাচদের দখলে যাওয়া এই দ্বীপটি পরবর্তীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং বর্তমানে এটি নেদারল্যান্ডসের একটি স্বশাসিত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১১ সালে স্বাধীন ফুটবল ফেডারেশন হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে যাত্রা শুরু করার পর থেকে কুরাসাওয়ের ফুটবলের উত্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। দেশটির এই ফুটবল বিপ্লবের মূল কারণ হলো ইউরোপে বেড়ে ওঠা ও বিভিন্ন লিগে খেলা কুরাসাওয়ান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে ফিরিয়ে আনা। ডাচ কিংবদন্তি প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, আর সেটিকে বর্তমান কোচ ডিক অ্যাডভোকাট আরও সফলভাবে এগিয়ে নেন। ডাচ ‘টোটাল ফুটবল’ দর্শন ও ক্যারিবীয় প্রাণবন্ত সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিশেলে গড়ে উঠেছে এই দলটি, যেখানে মাঠের বাইরে তাদের রঙিন জীবন যেমন রয়েছে, তেমনি মাঠে রয়েছে কড়া শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস। আগামী ১৪ই জুন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে আবারও মাঠে নামবে কুরাসাও, যেখানে তাদের সামনে সুযোগ থাকবে বিশ্বকাপের স্বপ্নকে আরও একধাপ বাস্তবে রূপ দেওয়ার।
তবে কুরাসাওয়ের এই রূপকথার বিশ্বকাপ যাত্রার সঙ্গে এবার অত্যন্ত গর্বের সাথে জড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের নাম। ২০২৬ সালের এই মেগা আসরে কুরাসাও দলের জন্য অফিশিয়াল জার্সি তৈরি করেছে বিশ্বখ্যাত জার্মান ক্রীড়া সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডিডাস’। আর এই বিশেষ জার্সির ফেব্রিক ডেভেলপমেন্ট (কাপড় উন্নয়ন) ও অ্যাপারেল ডেভেলপমেন্ট (পোশাকের নকশা ও উন্নয়ন) প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশের সন্তান সামিউর রেজা। সামিউর বর্তমানে জার্মানিতে অবস্থিত অ্যাডিডাসের গ্লোবাল প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত আছেন। ফলে বিশ্বমঞ্চের সবুজ গালিচায় কুরাসাওয়ের ফুটবলাররা যখন নিজেদের স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে মাঠে নামবেন, তখন তাদের গায়ে জড়িয়ে থাকবে এমন একটি জার্সি যার সুতোয় ও বুননে মিশে থাকবে একজন বাংলাদেশির মেধা ও পরিশ্রমের অবদান। ফুটবলের বৈশ্বিক অঙ্গনে এটি কেবল কুরাসাওয়েরই স্বপ্নযাত্রার গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের জন্যও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া বাণিজ্যের এক পরম গর্বের অধ্যায়।
