বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অস্ট্রিয়ার পার্লামেন্ট সম্প্রতি ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের জন্য স্কুলে হিজাব বা অন্যান্য ইসলামিক পোশাক পরিধান নিষিদ্ধ করার একটি বিতর্কিত বিল পাস করেছে। সরকার এটিকে মেয়েদের ‘নিপীড়ন থেকে রক্ষা করার’ পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করলেও, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞরা এটিকে বৈষম্যমূলক এবং সামাজিক সংহতি বিপন্নকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

আইনটিতে, ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের জন্য স্কুলে হিজাব (এবং বোরকাসহ ‘সব ধরনের’ ইসলামিক পর্দা) নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সাথে সাথেই আইনটি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হবে। এই আইনটি প্রায় ১২ হাজার মেয়ের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে সরকার জানিয়েছে। এর আগে অস্ট্রিয়া ২০১৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হিজাব নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু সাংবিধানিক আদালত তা বাতিল করে দেয়। সরকার এবার বলছে, নতুন আইনটি সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সরকারের রক্ষণশীল জোট এই নিষেধাজ্ঞার প্রধান প্রবক্তা। তারা দাবি করছেন, এই আইনটি মেয়েদের নিপীড়ন থেকে রক্ষা করবে এবং তাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।

অস্ট্রিয়ার রাজনৈতিক দল লিবারেল এনইওএস-এর আইনপ্রণেতা ইয়ানিক শেঠি বলেন…

আইনটি স্বাধীনতা সীমিত করার জন্য নয়, বরং ১৪ বছর পর্যন্ত মেয়েদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য করা হচ্ছে।

তার মতে, হিজাব অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পুরুষদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করার জন্য ব্যবহার করা হয় এবং মেয়েদের যৌনতাড়িত করে। অস্ট্রিয়ার তরুণ রাজনীতিবিদ এবং বর্তমানে ফেডারেল সরকারের মন্ত্রী ক্লডিয়া প্লাকম বলেন…

কোনো মেয়েকে পুরুষদের নজর থেকে রক্ষা করার জন্য শরীর ঢেকে রাখতে বলা কোনো ধর্মীয় আচার হতে পারে না, বরং এটি নিপীড়ন।

মানবাধিকার সংস্থা, অ্যাক্টিভিস্ট এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থাগুলো এই আইনটির তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা এটিকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি স্পষ্ট বৈষম্য বলে মনে করছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রিয়া এটিকে…

মুসলিম মেয়েদের প্রতি স্পষ্ট বৈষম্য এবং মুসলিমবিরোধী বর্ণবাদের প্রকাশ হিসেবে অভিহিত করেছে।

তারা সতর্ক করেছে যে, এই ধরনের পদক্ষেপ বিদ্যমান কুসংস্কারগুলোকে উসকে দিতে পারে।

অস্ট্রিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা-আইজিজিও বলেছে, এই নিষেধাজ্ঞা সামাজিক সংহতিকে বিপন্ন করে এবং শিশুদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না করে তাদের কলঙ্কিত এবং বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। নারী অধিকার সংস্থা অ্যামাজন-এর অ্যাঙ্গেলিকা আটৎসিনগার বলেন, এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মেয়েদের এই বার্তা দেয়া হলো যে তাদের শরীর সম্পর্কে (সরকারিভাবে) সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং সেটা বৈধ।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফরিদ হাফেজ মনে করেন…

এই উদ্যোগ শিশুদের সুরক্ষার জন্য নয়, বরং বর্জনকে স্থায়ী করা এবং ইসলামোফোবিয়াকে মূলধারার রাজনীতিতে স্বাভাবিক করার চেষ্টা।

তার মতে, এটি তরুণ মুসলিমদের কাছে একটি ভীতিকর বার্তা দিয়েছে যে তাদের পরিচয় অস্ট্রিয়ান সমাজে অবাঞ্ছিত।

ফেব্রুয়ারি থেকে আইনটির পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন শুরু হলেও, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। আইন কার্যকর হওয়ার পর তা অমান্য করলে অভিভাবকদের ১৫০ থেকে ৮০০ ইউরো, যা বাংলাদেশী টাকায় ২১ হাজার ৪৯৭ টাকা থেকে ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৪৮ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে।

এদিকে, অস্ট্রিয়ার অভিবাসনবিরোধী, অতি ডানপন্থি দলগুলো এই নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত করার দাবি জানাচ্ছে। এছাড়া ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ধর্মীয় পোশাক নিয়ে বিতর্কিত আইন রয়েছে। ফ্রান্স ২০০৪ সালে স্কুলগামী শিশুদের জন্য হিজাব, পাগড়ি বা ইহুদি টুপি পরা নিষিদ্ধ করেছিল। তারা তাদের ধর্ম নিরপেক্ষ আইনের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

গবেষক ফরিদ হাফেজ উল্লেখ করেছেন যে, অস্ট্রিয়া বর্তমানে ৪.৭ শতাংশ বাজেট ঘাটতির মতো গুরুতর অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে…

সরকার কৌশলগতভাবে এই হিজাব বিতর্ক ব্যবহার করে অর্থনীতির সমস্যা থেকে জনগণের মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করছে।

এই বিতর্কিত আইনটি শেষ পর্যন্ত অস্ট্রিয়ার আদালতে টিকে থাকবে কি না, তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, আইনটি বাতিল হলেও ইতিমধ্যে যে সামাজিক ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে গেছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version