ডেনমার্ককে বিশ্বের অন্যতম সুখী দেশ হিসেবে পরিচিত করার পেছনে যে কারণগুলোকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো, শিশুদের শৈশবেই “হ্যাপিনেস এডুকেশন” বা সুখশিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। প্রিস্কুল বয়স থেকেই ডেনিশ শিশুদের শেখানো হয়, সহানুভূতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, দলগত কাজ, সহযোগিতা ও নিজের অনুভূতি প্রকাশের দক্ষতা।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ শিক্ষা পদ্ধতিই শিশুদের সারাজীবনের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক আচরণকে ইতিবাচকভাবে গঠন করে। ডেনমার্কের শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার পর দেখেন, শৈশবে আবেগগত শিক্ষা না হলে বড় বয়সে স্ট্রেস, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বাড়ে, ছোট শিশুদের পরস্পরের অনুভূতি বুঝতে শেখালে সহিংসতা, বুলিং ও একাকীত্ব কমে। যারা ছোটবেলা থেকেই ‘এম্প্যাথি’ (অন্যের অনুভূতি, কষ্ট, আনন্দ বা মানসিক অবস্থা বুঝতে পারা এবং তা উপলব্ধি করার ক্ষমতা) শেখে, তারা ভবিষ্যতে কর্মজীবন ও সামাজিক জীবনে বেশি সফল হয়, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হলে সুখ ও মানসিক প্রশান্তি স্থায়ী হয়, ফলে হ্যাপিনেস এডুকেশনকে প্রিস্কুল পর্যায়ে বাধ্যতামূলক করা হয়।
শিশুদের যা শেখানো হয়
ডেনিশ প্রিস্কুলে নিয়মিতভাবে শিশুদের শেখানো হয়, বন্ধুর মন খারাপ হলে কীভাবে পাশে দাঁড়াতে হবে। কীভাবে নিজের রাগ, দুঃখ, ভয় বা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। খেলাধুলার পাশাপাশি শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, শান্ত হওয়ার ছোট ছোট অনুশীলন। বন্ধু তৈরি, দলগত খেলা, সমস্যা সমাধান, আলোচনার মাধ্যমে দ্বন্দ্ব মেটানো। অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহযোগিতা ও মানবিকতা তাদের শেখানো হয়।
প্রতিযোগিতামুক্ত পরিবেশ
অন্যান্য দেশের মতো প্রিস্কুলে পরীক্ষার চাপ, গ্রেড বা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা নেই। বরং আছে খেলা, সৃজনশীলতা, দলগত কাজ, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো এবং গল্প বলা ও অনুভূতি নিয়ে আলোচনা।এর ফলে শিশুরা খুব ছোট বয়স থেকেই নিরাপদ, মুক্ত ও শান্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠে।
মানসিক বা শারীরিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি শেখানোর ফলে ভবিষ্যতে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমে, বন্ধুদের প্রতি সহানুভূতি গড়ে ওঠে, ফলে একাকীত্ব কমে, প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতার মূল্য শেখায় এবং পরিবার ও সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত হয়।শিক্ষা পরিবেশে ভয় বা চাপ না থাকায় আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।
যে কারণে সুখী দেশের তালিকার শীর্ষে
বিশ্ব সুখ রিপোর্টে ডেনমার্ককে বছরের পর বছর শীর্ষ স্থানে রাখার কিছু কারণ হলো, মানসিক স্বাস্থ্যবান প্রজন্ম গঠন, পরিবার–কেন্দ্রিক জীবনযাপন, শিক্ষায় সমতা, কম স্ট্রেস ও উচ্চ সামাজিক নিরাপত্তা ও শিশুদের প্রথম দিন থেকেই শেখানো মানসিক স্থিতিশীলতা। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো, একটি সুখী জাতি গড়তে হলে শৈশব থেকেই সুখের শিক্ষা দিতে হয়, ডেনমার্ক সেটিই করেছে।
ডেনমার্কের ‘হ্যাপিনেস এডুকেশন’ শুধু পাঠ্যসূচির একটি অংশ নয়, এটি জাতীয় দর্শন। শিশুর প্রতি সহানুভূতি, মানবিকতা, মানসিক শক্তি ও সামাজিক বন্ধন শেখানোর এই মডেলকে এখন বিশ্বজুড়ে অনেক দেশ অনুসরণ করতে শুরু করেছে। একই সাথে ডেনমার্ক দেখিয়েছে যে, শিক্ষার মূল লক্ষ্য শুধু জ্ঞান নয়, মানুষের আবেগ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুখী জীবন তৈরি করা।
