আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও অভিবাসী পাচার চক্রের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন বৈশ্বিক অভিযান চালিয়ে বড় সাফল্যের দাবি করেছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে পরিচালিত এই অভিযানে মানবপাচার ও অভিবাসী পাচারের অভিযোগে তিন হাজার ৭০০ জনের বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে সম্ভাব্য চার হাজার ৪১৪ জন ভুক্তভোগী।
ইন্টারপোল জানায়, ‘লিবারটেরা থ্রি’ নামের এই অভিযান ১০ থেকে ২১ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত টানা ১২ দিন ধরে পরিচালিত হয়। এতে বিশ্বের ১১৯টি দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদার সংস্থা অংশ নেয়। অভিযানে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা ১২ হাজার ৯৯২ জন অভিবাসীর সন্ধান পাওয়া গেছে। ইন্টারপোলের ভাষায়, এটি মানবপাচার ও অভিবাসী পাচার চক্রের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্যতম বৃহৎ ও সমন্বিত বৈশ্বিক অভিযান।
আফ্রিকায় বড় সাফল্য, ভেঙে দেওয়া হয় শোষণ কেন্দ্র
এই অভিযানে বিশেষ সাফল্য আসে আফ্রিকা মহাদেশে। বেনিন, বুরকিনা ফাসো, কঙ্গো, কোট দিভোয়ার, ঘানা, সেনেগাল ও সিয়েরা লিওনের কর্তৃপক্ষের যৌথ অভিযানে মানবপাচার চক্রের বহু ঘাঁটি শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়। শুধু এই অঞ্চলেই দুই শতাধিক ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে। ইন্টারপোল জানায়, মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় সক্রিয় এসব চক্র সাধারণত বিদেশে ভালো কাজ ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে ফাঁদে ফেলে। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় অতিরিক্ত ‘নিয়োগ ফি’। পরে কাজের শর্ত সামান্য উন্নত করার আশ্বাস দিয়ে বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদেরও পাচারে জড়াতে বাধ্য করা হয়।
উন্নত ভবিষ্যতের প্রলোভনে যৌন শোষণ
অভিযানের সময় ইউরোপের একাধিক দেশে নারী পাচার ও যৌন শোষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। স্পেনে কর্তৃপক্ষ বার্সেলোনা ও মারবেল্লার বিভিন্ন সৌন্দর্য ও ম্যাসাজ সেলুনে অভিযান চালিয়ে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়। সেখানে ২১ জন নারী ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা হয়। ইন্টারপোল জানায়, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই কলম্বিয়ার নাগরিক। তাদের ওপর নিয়মিত নজরদারি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। প্রায় ছয় হাজার ইউরোর তথাকথিত ‘ঋণ’ শোধের নামে তাদের জোরপূর্বক দেহব্যবসায় বাধ্য করা হয়।
একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে কাজাখস্তানে। সেখানে কিছু চক্র সাউনা কেন্দ্রের আড়ালে দেহব্যবসা পরিচালনা করত এবং পুরো কার্যক্রম ‘ট্যাক্সি সার্ভিস’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। মালিতে কর্তৃপক্ষ ৪৭ জন নাইজেরিয়ান নারীকে শনাক্ত করেছে, যাদের যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে দেশটিতে আনা হয়েছিল।
ইউরোপমুখী বিপজ্জনক অভিবাসন রুট
‘লিবারটেরা থ্রি’ অভিযানের আরেকটি বড় লক্ষ্য ছিল ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসন রুট। ইন্টারপোল জানায়, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই বহু নৌকা আটক করা হয়েছে, যেগুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণভাবে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এসব নৌকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামও ছিল না। এই অভিযান সেনেগালের উপকূল ছাড়াও গিনি বিসাউ, মরক্কো ও আলজেরিয়ার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে পরিচালিত হয়, যেখানে মানবপাচারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়।
যুক্তরাজ্যে নতুন কৌশল
যুক্তরাজ্যে ইন্টারপোল একটি ভিন্নধর্মী কৌশল গ্রহণ করে। লজিস্টিক ও পরিবহন খাতের সঙ্গে যৌথভাবে একটি কর্মসূচি চালু করা হয়। বিশ্রাম এলাকাগুলোতে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করে ট্রাকচালকদের সঙ্গে কথা বলা, ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্ত করা, তথ্য সংগ্রহ এবং গোপন অভিযোগ উৎসাহিত করা হয়। এর ফলে ট্রাকে করে গোপনে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করা বহু অভিবাসীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
বিবিসির তথ্যমতে, ২০২৪ সালে পাঁচ হাজারেরও বেশি অভিবাসী গোপনে যানবাহনে লুকিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করেন। যদিও এই পদ্ধতি পাচারকারী চক্রও ব্যবহার করে, তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি অর্থহীন ও চরম হতাশ অভিবাসীদের শেষ ভরসা।
এই বাস্তবতার মানবিক দিকটি ফুটে ওঠে ১৭ বছর বয়সী সুদানি কিশোর আমজাদের কথায়। তিনি ফ্রান্সের কালে শহরের একটি অস্থায়ী শিবিরে থাকেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ট্রাকে করে যুক্তরাজ্যে পার হওয়ার চেষ্টা তিনি ২০ বারেরও বেশি করেছেন।
আমজাদের ভাষায়, পুলিশের চেকপয়েন্টের চেয়ে ট্রাকচালকদের সহিংস আচরণই বেশি ভয়ংকর। তিনি বলেন, একদিন এক চালক আমাকে চাপা দিতে চেয়েছিল। আরেকবার আমাকে জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। প্রতিদিন ভোর তিনটার দিকে ক্লান্ত শরীরে শিবিরে ফিরে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন, আমরা জানি এটা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আর কী উপায় আছে? নৌকায় ওঠার জন্য কি আমার কাছে টাকা আছে?।
বৈশ্বিক সতর্কবার্তা
ইন্টারপোল বলছে, এই অভিযান মানবপাচার চক্রের শক্ত কাঠামো ও বৈশ্বিক বিস্তৃতি স্পষ্ট করে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে, সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ছাড়া এই অপরাধ দমন সম্ভব নয়। সংস্থাটির মতে, পাচারবিরোধী আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দারিদ্র্য, সংঘাত ও অভিবাসন সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান না করলে মানবপাচার বন্ধ করা যাবে না।
