বৃহস্পতিবার, ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ৩০ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইতালি বর্তমানে শুধু আইন করে বসে নেই, বাস্তবে অবৈধ কর্মী নিয়োগ, শ্রম শোষণ ও কাগজবিহীন শ্রমিকদের দুর্দশা মোকাবিলায় ব্যাপক অভিযান, তদন্ত, সরকারি নীতি ও আন্তর্জাতিক সমঝোতা উদ্যোগ নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সংস্থা-সূত্রে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণে তুলে ধরা হলো।

বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড‑সমূহের শ্রম শোষণ

ইতালীয় ফ্যাশন শিল্পে শ্রমিক শোষণ নিয়ে একাধিক নিউজ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। মিলান ও অন্যান্য শহরে তদন্তে দেখা গেছে, উপ-চুক্তিকর্তার কারখানাগুলোতে  অনেক চীনা শ্রমিক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময়, কম মজুরি, এবং অমানবিক পরিবেশে কাজ করছে।

এই ঘটনায় ১৩টি বড় ফ্যাশন কোম্পানির কাছ থেকে তদন্তের জন্য নথি তলব করা হয়েছে। এতে নাম রয়েছে দোলচে অ্যান্ড গাব্বানা, ভারসাচে, প্রাদা ও গুচ্চিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের। শ্রমিকদের সঙ্গে অন্যায় এবং অবৈধ নিয়োগের প্রমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই ধারাবাহিকতায় ‘টড’স’ নামে ফ্যাশন গোষ্ঠী এবং তার এক্সিকিউটিভদের বিরুদ্ধে শ্রম শোষণের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে, যেখানে শ্রমিকরা অত্যধিক কাজ করছে, কম মজুরি পাচ্ছে এবং তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত নয়।

এটি ইতালির শ্রম আইন রক্ষা ও শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার গুরুতর প্রচেষ্টার প্রমাণ, যেখানে শুধু আইনি দায় নয়, প্রায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সাপ্লাই চেইন পর্যন্ত নজরদারি করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক লজিস্টিক ও ডেলিভারি ফার্মের বিরুদ্ধে জরিমানা

ইতালীয় প্রসিকিউটররা লজিস্টিক ও ডেলিভারি সার্ভিস কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত চালিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ‘ডিএইচএল এক্সপ্রেস ইতালি’এর বিরুদ্ধে ৪৬.৮ মিলিয়ন ইউরো  অর্থ জব্দ করা হয়েছে, কারণ তারা শ্রম আইন ও কর আইন অগ্রাহ্য করে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম সরবরাহ চেইন ব্যবহার করছিল। এছাড়া আমাজনের ইতালীয় ইউনিটও শ্রম ও কর সংক্রান্ত তদন্ত নিষ্পত্তিতে ১৮০ মিলিয়ন ইউরো পরিশোধ করেছে, যেখানে অভিযোগ ছিল তারা শ্রমিকদের সরবরাহ ও কর প্রদানে বিভিন্ন আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করছিল। এই ঘটনা শুধু শ্রম নিয়োগের আইন প্রয়োগ নয়, বরং বড় করপোরেটদের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলা ও শ্রম নীতি নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক ইঙ্গিত দেয়।

অপরাধী ও মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে সতর্ক বার্তা

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি দেশের অবৈধ অভিবাসন ও শ্রম নিয়োগ ব্যবস্থায় অবৈধ ভিসা, ভিসা প্রতারণা এবং মাফিয়া-গ্রুপের হস্তক্ষেপ নিয়ে সরাসরি সতর্ক করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে,  ক্রিমিনাল গ্যাংরা ভিসা সিস্টেম ব্যবহার করে অপরাধমূলকভাবে ব্যক্তিদের দেশে নিয়ে আসে, এবং তা নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিষিদ্ধ বা ভুলভাবে কাজ করা অভিবাসীদের শনাক্তকরণ, তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভুল পথে প্রবেশ করা শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেওয়া যায়।

কাজের জন্য অনিয়মিত অবস্থানে থাকা শ্রমিকদের সংখ্যা ও ঝুঁকি

সিসিলির মতো অঞ্চলগুলোতে প্রায় ৬২ হাজার অবৈধ শ্রমিক প্রধানত কৃষি খাতে কাজ করছে। এটি শ্রম শোষণ ও দুর্ব্যবহার বৃদ্ধি পায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে। সেখানে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা, আইনগত অধিকার বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই। এমন অবস্থা শ্রমিকদের জন্য শুধু অর্থনৈতিক ঝুঁকি নয়, বরং মানবাধিকার ও মৌলিক কর্ম-নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে।

সরকারী প্রয়াস ও সমঝোতা

ইতালি সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার ও মানবাধিকার সংস্থা অবৈধ শ্রম শোষণ প্রতিরোধে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ করেছে। ইতালির অভিবাসন ও শ্রম নীতি পরিবর্তনের জন্য এমওইউ-র মতো চুক্তি ও দেশসমূহের সঙ্গে সহযোগিতা করা হচ্ছে,  যেমন বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে স্বাক্ষরিত মেমোরান্ডাম, যার লক্ষ্য অবৈধ অভিবাসন কমিয়ে বৈধ পথে কর্মী নিয়োগ বাড়ানো। এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সঠিক ও নিরাপদ অভিবাসন পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে।

বিশ্লেষণে মূল বিষয়গুলো

ইতালি শুধু শ্রম আইন তৈরি করছে না, বাস্তবে বড় মামলা ও প্রয়োগ অভিযান চালাচ্ছে, আন্তর্জাতিক সংবাদে তা প্রত্যক্ষ হচ্ছে। শ্রম শোষণ ও কাগজবিহীন শ্রমিক নিয়োগ সম্পর্কে বিভিন্ন শিল্প ও বড় সংস্থা‑সমূহের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। রাজনৈতিক পর্যায়ে অবৈধ ভিসা ও মাফিয়া‑গ্যাং-এর হস্তক্ষেপ নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের জটিল বাস্তবতা, যেমন কৃষি খাতে ব্যাপক কাগজবিহীন শ্রমিকের উপস্থিতি, তা সমাজে অর্থনৈতিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ উন্মোচন করছে।

ইতালির কঠোর অবস্থান শুধু আইন প্রণয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবে আন্তর্জাতিক অভিযানে বড় কোম্পানি থেকে শুরু করে ছোট শ্রম নিয়ম ভঙ্গকারী, কাগজবিহীন শ্রমিকদের দুর্দশা ও শ্রম শোষণ সংক্রান্ত ধারা‑ধারণা পর্যন্ত সরকারের নজরদারি ও পদক্ষেপ রয়েছে।

এটি শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়,  গ্লোবাল অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সম্পর্কিত একটি বড় পরিবর্তনের অংশ।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version