তীব্র তাপদাহে স্পেনে গত ১ জুন থেকে ১৯ আগস্টের মধ্যে আনুমানিক ৪,৪৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই চরম আবহাওয়ার কারণে কেবল স্পেন নয়, বরং পুরো ইউরোপজুড়েই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে প্রাণহানি।
স্পেনের রাষ্ট্রীয় ‘কার্লোস ৩ হেলথ ইনস্টিটিউট’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের দুই বছরের তুলনায় এই গ্রীষ্মে তাপদাহে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। ২০২৫ সালের একই সময়ে স্পেনে ৩,০৭৩ জনের এবং ২০২৪ সালে ১,৮৯০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এবারের ৪,৪৫৮ জনের এই সংখ্যাটি ২০২২ সালের রেকর্ড ৪,৫২০ জনের মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
স্পেনের এই সংখ্যাগুলো দেশটির ‘মর্টালিটি মনিটরিং সিস্টেম’-র মাধ্যমে প্রাক্কলন বা অনুমান করা হয়েছে, যা স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা ‘এইমেট’-এর তাপমাত্রার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর হার বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাবদাহ সরাসরি সব মৃত্যুর কারণ না হলেও, তীব্র গরম মানুষের শরীরের রক্তসংবহনতন্ত্র বা হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ফলে আগে থেকেই হৃদরোগ বা অন্যান্য জটিলতায় ভুগতে থাকা রোগীরা স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গ্রীষ্মের এই তীব্র গরমের পাশাপাশি স্পেনে চরম খরা পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে, যার ফলে বেশ কয়েকটি ভয়াবহ দাবানলের সৃষ্টি হয়েছে। স্পেনের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সালের পর এবারের জুলাই মাসটি ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে শুষ্ক ও সবচেয়ে উত্তপ্ত জুলাই। দাবানলের কারণে জুলাই মাসেই হাজার হাজার মানুষকে বাড়িঘর থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
পুরো ইউরোপজুড়েই মৃত্যুর মিছিল
ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর পরিস্থিতিও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। জার্মানির ‘রবার্ট কচ ইনস্টিটিউট’-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জার্মানিতে তাপদাহে আনুমানিক ১৪,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা ২০১৬ সালের পর দেশটিতে বার্ষিক মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড।
এর মধ্যে কেবল জুন মাসের শেষ সপ্তাহের তীব্র গরমেই মারা যান প্রায় ৯,৬০০ জন, যখন দেশের কিছু অংশের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মৃতদের মধ্যে ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি। রবার্ট কচ ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরম এবং আগে থেকে শরীরে থাকা অসুস্থতা মিলেই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই ডেথ সার্টিফিকেটে সরাসরি ‘দাবদাহে মৃত্যু’ লেখা না থাকলেও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই প্রকৃত চিত্র পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা ‘সান্তে পাবলিক ফ্রান্স’ জানিয়েছে, তীব্র তাপদাহের কারণে ফ্রান্সে এ বছর এ পর্যন্ত ৭,৩০০ জনেরও বেশি মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
স্পেন, জার্মানি ও ফ্রান্স—কেবল এই তিনটি দেশের সরকারি পরিসংখ্যান যোগ করলেই ২০২৬ সালের এই গ্রীষ্মকালীন দাবদাহে মৃত্যুর সংখ্যা ২৫,০০০ ছাড়িয়ে যায়। ইতালি এখনও তাদের চূড়ান্ত মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করেনি, তবে জুনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মৃত্যুর হার সাধারণ সময়ের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি ছিল।
ইউরোপজুড়ে একের পর এক তাপদাহে তাপমাত্রা নিয়মিত ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠছে, যা জনস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, এই গ্রীষ্মের চূড়ান্ত মানবিক বিপর্যয় এখনও সম্পূর্ণ জানা যায়নি, কারণ আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শেষভাগে এসে সাধারণত মৃত্যুর এই গ্রাফ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
