ইউরোপের স্বপ্নে বিভোর হয়ে দালালের হাত ধরে মরণযাত্রায় সামিল হওয়া সুনামগঞ্জের ১০ তরুণের স্বপ্ন এখন পুরো পরিবারের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। ভূমধ্যসাগরে টানা ৬ দিন খাদ্য ও পানীয়হীন অবস্থায় থাকার পর লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ বাংলাদেশি, যার মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।
অভাব-অনটনের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে লিবিয়ার হয়ে ইতালি ‘মৃত্যুপুরী’ পাড়ি দিতে গিয়ে অকালে ঝরে গেল এই তাজা প্রাণগুলো। নিহতদের মধ্যে একই গ্রামের তিন তরুণ থাকায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের মাতম।
নিহতদের স্বজনরা জানিয়েছেন, দালালরা নিরাপদ যাত্রার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও মাঝ সমুদ্রে তাঁদের কোনো খাবার বা পানি দেয়নি। দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের মাওলানা সাজিদুর রহমান (২৮), যিনি স্থানীয় মসজিদে ইমামতি করতেন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন এই অনিশ্চিত পথে। তাঁর বৃদ্ধ পিতা আব্দুল গনি বিলাপ করতে করতে বলছেন, “ছেলের সুখ দেখতে চেয়েছিলাম, এখন তার লাশটা কাঁধে নেওয়ার সুযোগও নেই।” একই গ্রামের নুরুজ্জামান ময়না (৩০) ও সাহান এহিয়ার (২৫) পরিবারও আজ নিঃস্ব। গত ১৫ জানুয়ারি বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়া এই তরুণরা দালালের দেওয়া ‘নিশ্চিত গেম’-এর মিথ্যা আশ্বাসে প্রাণ হারালেন।
সুনামগঞ্জের নিহত ১০ জনের তালিকা (পরিচয়):
দিরাই উপজেলা:
১. মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০) – তারাপাশা গ্রাম, কুলঞ্জ ইউনিয়ন।
২. সাজিদুর রহমান (২৮) – তারাপাশা গ্রাম, কুলঞ্জ ইউনিয়ন।
৩. শাহান এহিয়া (২৫) – তারাপাশা গ্রাম, কুলঞ্জ ইউনিয়ন।
৪. মুজিবুর রহমান (৩৮) – রাজানগর ইউনিয়ন।
জগন্নাথপুর উপজেলা:
৫. সোহানুর রহমান – চিলাউড়া গ্রাম।
৬. শায়েক আহমেদ – টিয়ারগাঁও গ্রাম।
৭. মো. নাঈম – চিলাউড়া কবিরপুর গ্রাম।
৮. আমিনুর রহমান – পাইলগাঁও গ্রাম।
৯. মোহাম্মদ আলী – ইছগাঁও গ্রাম,
দোয়ারাবাজার উপজেলা।
১০. আবু ফাহিম – কবিরনগর গ্রাম।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানিয়েছেন, যেহেতু তাঁরা বৈধ পথে যাননি, তাই আগে থেকে তথ্য ছিল না। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেনও বিষয়টির সত্যতা যাচাই করছেন। বর্তমানে গ্রিসের বাংলাদেশ মিশন আইওএম-এর সহায়তায় নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়, সেজন্য স্থানীয়দের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বেঁচে ফেরা ও ফিরে আসা পরিবারের সদস্যরা।
