যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্সে অভিবাসী পাচারের অভিযোগে একটি মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের মোট ৮৪ বছরের বেশি কারাদণ্ড দিয়েছেন ব্রিটিশ আদালত। চক্রটি মূলত বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের নাগরিকদের কাছ থেকে প্রত্যেকের জন্য ১ হাজার ৮০০ ডলার করে নিয়ে তাঁদের ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সে পাঠানোর ব্যবস্থা করত।
অভিবাসীরা বৈধ ভিসায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন। পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে অবৈধভাবে কাজ করার উদ্দেশ্যে সীমান্ত তল্লাশি এড়িয়ে ফ্রান্সে যেতে চক্রটির সহায়তা নিতেন তাঁরা।
পাচারের জন্য প্রথমে অভিবাসীদের লন্ডন থেকে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কাউন্টি কেন্টে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে চক্রের নিয়োগ করা ট্রাকচালকেরা অপেক্ষা করতেন। পরে ট্রাকে তুলে ফেরির মাধ্যমে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে তাঁদের ফ্রান্সে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) ২১ সদস্যের এই চক্রের কার্যক্রম নজরদারিতে রাখে। সংস্থাটি যুক্তরাজ্য থেকে অভিবাসী পাচারের চেষ্টার ১০টি ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এসব অভিযান নস্যাৎ করা হয়। এ সময় মোট ১৯৬ জন অভিবাসীকে আটক করা হয়।
এনসিএ প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অভিবাসীরা একটি শিল্প এলাকার নির্ধারিত স্থানে এসে ট্রাকে উঠছেন। থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরায় ধারণ করা আরেকটি ফুটেজে ট্রাকের ভেতরে গাদাগাদি করে থাকা অভিবাসীদের দেখা যায়। অন্য ফুটেজে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের একটি ট্রাক ও ভ্যানের পেছনের দরজা খুলে ভেতরে থাকা অভিবাসীদের উদ্ধার করতে দেখা যায়।
আদালতের শুনানি শেষে চক্রটির সংগঠক এবং রোমানিয়া ও উত্তর মেসিডোনিয়ার কয়েকজন চালককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চক্রটির সংগঠকদের বাড়ি লন্ডনে।
চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন ৪৪ বছর বয়সী সুহাল আহমেদ। মানবপাচারের অভিযোগ স্বীকার করায় তাঁকে সাড়ে আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ২৬ বছর বয়সী সুহেল আহমেদ অভিবাসীদের কাছ থেকে প্রত্যেকের জন্য ১ হাজার ৮০০ ডলার করে সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি তাঁদের কেন্টে নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সিচালকদের অর্থ দিতেন তিনি। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
৫০ বছর বয়সী মিনিক্যাবচালক রোবিউল ইসলাম লন্ডন থেকে অভিবাসীদের কেন্টে নিয়ে যেতেন। একই কাজে অন্য চালকদের সংগঠিত করতেও সহায়তা করেছিলেন তিনি। নিজের ভূমিকার কথা স্বীকার করার পর তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া চক্রটির সঙ্গে ভারী পণ্যবাহী ট্রাক ও ভ্যানচালকদের যোগাযোগ করিয়ে দিতেন ৫৪ বছর বয়সী রোমানিয়ার নাগরিক নিকুসর লাকাতুস। অর্থের বিনিময়ে অভিবাসীদের পরিবহন করতে রাজি এমন চালকদের খুঁজে দিতেন তিনি। তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এনসিএর জ্যেষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা জন টার্নার বলেন, এই রায়ের মধ্য দিয়ে একটি বড় মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের সমাপ্তি ঘটেছে। তদন্তের মাধ্যমে সংগঠক থেকে শুরু করে অভিবাসীদের অবৈধভাবে পরিবহনে নিয়োজিত চালকদেরও আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইংলিশ চ্যানেলের যেকোনো দিক দিয়ে মানুষ পাচার করে অর্থ উপার্জনের চিন্তা করছেন, তাঁদের জন্য এই রায় সতর্কবার্তা। এ ধরনের অপরাধে জড়ালে ধরা পড়ার আশঙ্কা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
যুক্তরাজ্যে অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধ দমনে এত দিন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় ব্রিটেনে প্রবেশের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্টো পথে, অর্থাৎ যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্সে অভিবাসী পাঠানোর একটি নতুন পাচার ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে।
যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর এ ধরনের পাচারের প্রবণতা বেড়েছে। পর্যটক ভিসায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের পর ইইউর দেশগুলোতে অবৈধভাবে যাওয়ার চেষ্টা করেন কিছু অভিবাসী। গাড়ির ভেতরে গোপনে ফ্রান্সে প্রবেশ করতে পারলে তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এর আগে গত বছর একই ধরনের আরেকটি মানবপাচারকারী চক্রের কার্যক্রমও ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। আলজেরীয়দের নেতৃত্বাধীন ওই চক্রটি ট্রাকে গাদাগাদি করে অভিবাসীদের যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্সে পাচার করত।
