ফ্রান্স জুড়ে ‘দৈত্যাকৃতি’ বিশাল দাবানল অনিয়ন্ত্রিত তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। আগুনের বিকট শিখা এখন বিখ্যাত ওয়াইন উৎপাদনকারী শহর বোর্দোর (Bordeaux) মাত্র সাত মাইলেরও কম দূরত্বে চলে এসেছে। আকাশ জুড়ে তৈরি হয়েছে এক আতঙ্কজনক বিশাল ‘ফায়ার ক্লাউড’ বা আগুনের মেঘ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ছুটি কাটাতে আসা পর্যটকদের অবিলম্বে ওই এলাকা ত্যাগ করতে এবং নতুন করে কাউকেই সেখানে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ফ্রান্সে তৈরি হওয়া এই অভূতপূর্ব আগুনের মেঘকে বলা হয় ‘পাইরোকিউমুলোনিম্বাস’ (Pyrocumulonimbus)। এটি নিজস্ব বাতাস তৈরি করে দাবানলকে চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং এ থেকে তৈরি বজ্রপাত নতুন নতুন স্থানে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফ্রান্স ও স্পেন মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
১২ লক্ষাধিক মানুষের বসতি এবং বিখ্যাত ওয়াইন উৎপাদনকারী অঞ্চল বোর্দোর ওপর এখন ধোঁয়ার ঘন আস্তরণ জমেছে। আগুন যে কোনো সময় শহরে ঢুকে পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় পুরো শহর খালি করার বিষয় খতিয়ে দেখছে সিটি কাউন্সিল।
লে বার্প এলাকার বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ক্যাবিনেট বৈঠক ডেকেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। ফায়ার ফাইটারদের সহযোগিতায় এবং আগুনের পথরোধ করতে ইতোমধ্যে মাঠে ফরাসি সামরিক বাহিনী নামানো হয়েছে।
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানিয়েছেন, চলতি বছরে ফ্রান্সে দাবানলে ২ লাখ ৮৪ হাজার একরেরও বেশি বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বর্তমানে দেশকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি নতুন দাবানলের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পরিস্থিতি কতটা বেসামাল তা বোঝাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিস চিফ এরিক বোকার্দি বলেন, “এটি যেন ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’-এর মতো এক অসম লড়াই।”
স্পেনে প্রাণহানি ও জাতীয় জরুরি অবস্থা
এদিকে স্পেনের অবস্থাও চরম উদ্বেগজনক। রাজধানী মাদ্রিদের বাইরে তিনটি বড় দাবানল এক হয়ে নতুন বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। ফলে সেখান থেকে ৭৭ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ধোঁয়ার কারণে আরও ২৮ হাজার মানুষকে ঘরের ভেতর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভ্যালেন্সিয়ায় দাবানল নেভানোর সময় গাড়ির ভেতর থেকে সত্তরোর্ধ্ব এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছেন ফায়ার ফাইটাররা। স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সতর্ক করে বলেছেন যে, “সামনে আরও কঠিন সময় আসছে।” মাদ্রিদের প্রসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো একে অঞ্চলটির ইতিহাসের “সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর আগুন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
দুর্ভোগে ব্রিটিশ পর্যটকরা
দাবানলের কারণে ওই অঞ্চলে ঘুরতে আসা হাজার হাজার পর্যটক চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বোর্দো বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত ‘হলিডে ইন’ হোটেলে অবস্থানরত ব্রিটিশ পর্যটকদের রাত সাড়ে ৩টায় ঘুম থেকে তুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ধোঁয়ার কারণে পুরো এলাকার দৃশ্যমানতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত পর্যটকদের এই অঞ্চল এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
তথ্যসূত্র: দ্য সান

