মঙ্গলবার, ২৮ই জুলাই, ২০২৬   |   ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সের বিখ্যাত শহর বোর্দোর কাছাকাছি জিরোন্ডে অঞ্চলে দাবানল নিয়ন্ত্রণে দমকলকর্মীরা যখন প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে, স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের কাছাকাছি ছড়িয়ে পড়া আগুন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া তীব্র দাবানলের কারণে গত রবিবার রাতে এক ধাক্কায় আরও ৫৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কেবল একটি অঞ্চলেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২০ হাজারে। আগুনের লেলিহান শিখা বিখ্যাত এই ওয়াইন উৎপাদনকারী শহর বোর্দোর আরও কাছাকাছি চলে এসেছে।

জিরোন্ডে অঞ্চলে সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে লাগা এই আগুন বাতাসের দিক পরিবর্তন, ঝড়ো হাওয়া এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ফলে আগুন ছড়িয়ে পড়া রোধে দমকলকর্মীদের ব্যাপক প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ রবিবার রাতে ঐতিহাসিক বোর্দো শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত পাঁচটি এলাকায় নতুন করে উচ্ছেদের নির্দেশ জারি করে।

প্যারিসের চেয়ে চার গুণ বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে দিনরাত কাজ করা দমকলকর্মীদের জন্য ‘আরেকটি কঠিন রাত’ পার করার পর ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেন, ‘পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত প্রতিকূল রয়ে গেছে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে নুনেজ লিখেছেন, ‘আগুন আবারও অত্যন্ত উগ্র ও অপ্রত্যাশিত রূপ ধারণ করেছে। এটি নিজেই ঝড়ো হাওয়া তৈরি করছে এবং অনিয়মিতভাবে বোর্দো মহানগর এলাকার দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।’
মন্ত্রী আরও যোগ করেন, ‘তবে রাতের শেষভাগে এসে আগুন কিছুটা শান্ত হয়েছে।’
ম্যানহাটনের চেয়ে সাত গুণ বড় এলাকা ভস্মীভূত

জিরোন্ডের আঞ্চলিক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে আনুমানিক ৪২ হাজার হেক্টর বন ও ঝোপঝাড় এলাকা পুড়ে গেছে, যা একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আগে থেকেই অত্যন্ত শুষ্ক ছিল। ভস্মীভূত হওয়া এই এলাকাটি নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন দ্বীপের চেয়ে সাত গুণ এবং প্যারিস শহরের চেয়ে চার গুণ বড়।

দমকলকর্মীরা অনবরত আগুন নিয়ন্ত্রণে ট্রাক নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন এবং ধোঁয়াচ্ছন্ন আকাশে বিমান থেকে পানি ও রাসায়নিক ছেটানো হচ্ছে। দমকলকর্মীরা যেন বিরতিহীনভাবে আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, সেজন্য স্থানীয় কৃষকরা ট্যাংকে করে পানি সরবরাহ করছেন।
স্থানীয় এক আঙুর চাষি থিও হার্নান্দেজ বলেন, ‘এর ফলে দমকলকর্মীরা সম্পূর্ণ মনোযোগ আগুনের ওপর দিতে পারছেন। এই আগুন অত্যন্ত তীব্র ও মারাত্মক গতিতে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে।’

বর্তমানে ২৫০০ ফায়ার সার্ভিস কর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। এছাড়া বিমান ও হেলিকপ্টার নিয়ে আকাশপথে হয়তো অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর বিমানসহ মোট ১৮টি বিমান নিয়োজিত রয়েছে। স্থলবাহিনীর সাহায্যার্থে সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়েছে, যারা ‘এ৪০০এম’ সামরিক কার্গো বিমান দিয়ে বিশেষ রাসায়নিক ছিটিয়ে চলেছে।

জিরোন্ডে প্রশাসন জানিয়েছে, আগুন নেভানোর চেষ্টায় নিযুক্ত ৮৪ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মীকে জখমের কারণে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এ আগুনে শত শত ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।

স্পেনে মাদ্রিদের আশেপাশের এলাকায় দাবানল তীব্র আকার ধারণ করলেও তা এখন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসছে। গত রবিবার ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলেও মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত শনিবার ভ্যালেন্সিয়ার উপশহর ম্যানিসেস-এ দাবানলের আগুনে পুড়ে এক ব্যক্তি মারা যান, যা স্পেনের চলমান দাবানলে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা।
গত রবিবার স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ বলেন, ‘আমাদের সামনে আরও কিছু কঠিন সময় রয়েছে।’ তবে তিনি যোগ করেন যে, রাতটি ‘আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক ছিল।’

স্পেন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এ পর্যন্ত মোট ৭৬ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং অন্য ৩০ হাজার মানুষকে নিজ ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা দীর্ঘ সময় পর বাড়ি ফিরে কী দেখতে পাবেন, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমে চাপিনেরিয়া থেকে নিজের পোষা কুকুর নিয়ে চলে আসা রোকিও ডোমিঙ্গুয়েজ বলেন, ‘এটিকে কেয়ামতের মতো মনে হচ্ছিল। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। চারপাশ শুধু ছাইয়ে ঢাকা ছিল।’

তিনি আরও বলেন,‘আমরা জানি না যখন এই শহরে ফিরে যাব, তখন আমাদের ঘরটি অক্ষত পাব নাকি অর্ধেক পোড়া দেখব, নাকি কোনো ঘরই থাকবে না। আমাদের সমস্ত জামাকাপড়, স্মৃতি—সবকিছুই সেখানে রয়ে গেছে।’

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version