বুধবার, ১লা জুলাই, ২০২৬   |   ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জার্মানিতে মুসলিম নাগরিকদের প্রতি বৈষম্য, মৌখিক হেনস্তা, শারীরিক আক্রমণ ও বর্ণবাদী আচরণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া ‘মুসলিম-বিরোধী ঘটনার’ এক নতুন বার্ষিক প্রতিবেদনে এই ভীতিজনক চিত্র সামনে এসেছে। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এগুলো কেবলই কোনো গাণিতিক সংখ্যা নয়; বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে জড়িয়ে রয়েছে একেকটি মানুষের আতঙ্ক ও চরম হেনস্তার বাস্তব গল্প।

বিগত ২০২০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জার্মানির হানাউ শহরে কট্টরপন্থিদের এক ভয়াবহ বর্ণবাদী হামলা থেকে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া এত্রিস হাশেমি গত বুধবার বার্লিনে এই প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন। ওই হামলায় হাশেমি তাঁর নিজের ভাইকে হারিয়েছিলেন। বর্তমানে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব বাই-ন্যাশনাল ফ্যামিলিজ অ্যান্ড পার্টনারশিপ’ নামের সংগঠনের প্রধান হাশেমি বলেন, “হানাউয়ের সেই নৃশংস ঘটনাটি প্রমাণ করেছে যে সমাজে অন্য ধর্ম বা বর্ণের মানুষকে অবহেলা করা, অমানবিক আচরণ এবং বর্ণবাদী অন্ধবিশ্বাস মানুষকে কতটা ভয়ঙ্কর পথ বেছে নিতে বাধ্য করতে পারে।”

জার্মানির ‘কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট ইসলামোফোবিয়া অ্যান্ড অ্যান্টি-মুসলিম হোস্টালিটি’ প্রতি বছর ‘সিভিল সোসাইটি অ্যাসেসমেন্ট অব অ্যান্টি-মুসলিম রেসিজম’ নামে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে থাকে। তাদের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালে জার্মানিতে মুসলিম-বিরোধী মোট ৪ হাজার ৯৬টি ঘটনা ঘটেছে। এই সংখ্যাটি তাঁর আগের বছরের (২০২৪ সাল) তুলনায় প্রায় ১ হাজার বেশি। এর আগে ২০২৩ সালে দেশটিতে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮০টি।

প্রতিবেদনে গত বছরের অপরাধ ও বৈষম্যের ধরণগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:

মৌখিক আক্রমণ: মোট ঘটনার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বা ২ হাজার ৩৭৯টি ছিল সরাসরি মৌখিক গালিগালাজ ও হেনস্তা।

প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বৈষম্য: বিভিন্ন ক্ষেত্র ও কর্মসংস্থানে ৮৪০টি বৈষম্যের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

শারীরিক ও ক্ষতিকর হামলা: ৬৮০টি ঘটনা ছিল সরাসরি ক্ষতিকর আচরণ, যার মধ্যে ২৪১টি শারীরিক হামলা, ৪টি অতি মারাত্মক হামলা এবং ২টি সরাসরি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা রয়েছে।

মসজিদে আক্রমণ: বিভিন্ন মসজিদে অন্তত ৬১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা, বোমা হামলার হুমকি এবং মসজিদের দেয়ালে বর্ণবাদী বা নাৎসিদের ‘স্বস্তিকা’ চিহ্ন এঁকে দেওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে।

জার্মানির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে ১৫টি রাজ্যের মোট ৩৮টি কাউন্সেলিং ও ডকুমেন্টেশন সেন্টারের তথ্য, পুলিশি রেকর্ড, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং সরাসরি ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দিতে CLAIM-এর পক্ষ থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আইনি ও মানসিক সহায়তা জোরদার করা, মুসলিম-বিরোধী অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং দেশজুড়ে আরও বেশি কাউন্সেলিং কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জার্মান সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

পেশাগত কাজের অংশ হিসেবে জার্মানির বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়মিত কথা বলেন এত্রিস হাশেমি। তিনি জানান, “জার্মানিতে মুসলিম-বিরোধী বর্ণবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং অনেক মুসলিম শিক্ষার্থীর জন্য এটি দৈনন্দিন নির্মম বাস্তবতা।”

তবে এত প্রতিকূলতার মাঝেও তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে বেশ আশাবাদী হাশেমি। নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে তিনি বলেন, “আমি নতুন প্রজন্মকে নিয়ে ভীষণ আশাবাদী। ক্লাসরুমে বিভিন্ন দেশ বা সংস্কৃতি থেকে আসা শিক্ষার্থীরা যেভাবে একসাথে বড় হচ্ছে এবং একই লক্ষ্যে পড়াশোনা শেষ করছে, তা তাদের মাঝে একটি দারুণ বন্ধন তৈরি করছে। আমি বিশ্বাস করি, এই বৈচিত্র্যময় নতুন প্রজন্ম আগামী দিনে আমাদের চেয়ে অনেক সুন্দর ও বর্ণবাদমুক্ত একটি জার্মানি গড়ে তুলবে।”

তথ্যসূত্র: ইনফো মাইগ্রেন্টস বাংলা 

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version