দক্ষ শ্রমিক সংকট মোকাবিলা করতে অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে জার্মানি। দেশটির নতুন চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস নেতৃত্বাধীন সিডিইউ সরকার যোগ্য বিদেশিদের জন্য দরজা আরও বড় করে খুলবে, তবে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কঠোরতা বাড়ানো হবে।
সরকারের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জার্মানির স্বাস্থ্যসেবা, রিটেইল, নির্মাণ ও প্রযুক্তিখাতে উল্লেখযোগ্য শ্রমিক সংকট রয়েছে। গত বছর শুধু স্বাস্থ্যখাতেই প্রায় ৩ লাখ বিদেশি পেশাজীবী যোগ দিয়েছেন। বিদেশি কর্মী ছাড়া এসব সেবা খাত ‘ধসে পড়তে পারে’ বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন।
অন্যদিকে, আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠানো, একীকরণ ব্যর্থ হলে ভিসা না বাড়ানোসহ আরও কড়াকড়ির দিকে যাচ্ছে সরকার। ফলে দুই ধরনের নীতি একসঙ্গে পরিচালনার দিকে ঝুঁকছে বার্লিন।
বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য আলাদা দপ্তর
অভিবাসন কাঠামোকে দ্রুত ও কার্যকর করতে জার্মানি তৈরি করেছে নতুন দপ্তর। ‘কাজ ও থাকার অনুমতি বিষয়ক এজেন্সি’ নামের মন্ত্রীপরিষদ অনুমোদিত এই সংস্থাটি কাজ করবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে। মূল লক্ষ্য কর্ম ভিসা প্রদান দ্রুত করা, বিদেশি সনদের স্বীকৃতি প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজ করা, রেসিডেন্সি প্রসেস সহজ করা, নিয়োগকর্তাদের আমলাতান্ত্রিক ঝামেলা কমানো।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই দপ্তর আশ্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত নয়, তাই শরণার্থী ও কর্ম অভিবাসী, দুই ধরণের আবেদন একে অন্যকে প্রভাবিত করবে না। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন এজেন্সি চালু হলে বিদেশি যোগ্য কর্মী নিয়োগে সময় কমবে ৩০–৪০ শতাংশ।
জার্মানি শ্রমের দেশ
জার্মান রিটেইল অ্যাসোসিয়েশনের অনুষ্ঠানে চ্যান্সেলর ম্যার্ৎস বলেন, আমরা যোগ্য, দক্ষ ও কাজ করতে ইচ্ছুক বিদেশিদের চাই। জার্মানি একটি উদার ও সহনশীল দেশ, কাজ করতে চাইলে আমরা আপনাকে স্বাগত জানাই। তিনি উল্লেখ করেন, দ্রুতবর্ধনশীল শ্রমবাজার ধরে রাখতে আধুনিক অভিবাসন কাঠামো অপরিহার্য।
শরণার্থীদের বিষয়ে অবস্থান
অন্যদিকে সরকার শরণার্থীদের বিষয়ে আরও বাস্তববাদী হতে চায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডোব্রিন্ডট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন…
যারা সমাজে একীভূত হচ্ছেন না, কাজ করছেন না, তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, যারা একীভূত হয়েছেন এবং কর্মে নিযুক্ত, তাদের থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যারা নয়, তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম কঠোর হবে।
একইসঙ্গে তিনি আরও জানান…
যদি কোনো সিরীয় নাগরিক সুরক্ষা সুবিধা নিয়ে জার্মানিতে থাকেন এবং আবার নিজ দেশে ভ্রমণ করেন, তবে সেটি বোঝায় যে সেখানে তার নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। ফলে তাদের সুরক্ষা সুবিধা পুনর্মূল্যায়নের আওতায় পড়তে পারে।
শরণার্থী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, স্বল্পমেয়াদি যাত্রা দিয়ে দেশের নিরাপত্তা নির্ধারণ করা যায় না, বরং এতে জার্মানির আশ্রয় নীতি বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তবে ডোব্রিন্ডট সংগঠনগুলোর এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যে কারণে দ্বৈত কৌশলে জার্মানি
বিশ্লেষকদের মতে, জার্মান সরকারের এই পরিবর্তনের পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে। তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে শ্রমিক সংকট। দেশটিতে স্বাস্থ্যরসেবা, প্রযুক্তি, ইন্ডাস্ট্রি, রিটেইল, সবখানেই দক্ষ কর্মীর ভয়াবহ মাত্রায় ঘাটতি রয়েছে।
প্রত্যাবাসনের আইনি জটিলতাও এই দ্বৈত নীতির বড় একটা কারণ। অনেক শরণার্থীর ক্ষেত্রে দেশত্যাগ প্রক্রিয়া দীর্ঘ, আইনি বাধা ও মানবাধিকার সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এছাড়াও রয়েছে রাজনৈতিক চাপ। স্থানীয় পর্যায়ে অভিবাসন নিয়ে সমালোচনা, বাড়তি ব্যয় এবং নিরাপত্তা বিতর্ক সরকারকে কঠোর নীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর এসব কারণে সরকার একসঙ্গে দুই নীতি চালু করছে।
সামগ্রিক চিত্র
নতুন পরিকল্পনা দেখে এটা স্পষ্ট যে,জার্মান সরকার আশ্রয় আইনের চেয়ে অর্থনীতির কর্মী সংকট সমাধানে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই যে কেউ জার্মানিতে থাকতে চাইলে তাকে সমাজে একীভূত হতে হবে, নিয়মিত কাজ করতে হবে, কোনো ঝুঁকির আচরণ দেখালে ভিসা নবায়ন কঠোর হবে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি হওয়ায় জার্মানির এই নতুন অভিবাসন নীতি আগামী বছরগুলোতে ইউরোপের শ্রমবাজার ও অভিবাসন কাঠামোতে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।
