ইতালিতে বসবাসরত বিদেশিদের তুলনায় বিদেশে থাকা ইতালিয়ান নাগরিকের সংখ্যা এখন বেশি, এ তথ্য উঠে এসেছে ক্যাথলিক চার্চের মাইগ্রান্তেস ফাউন্ডেশনের সদ্য প্রকাশিত “ইতালিয়ানস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৫”-শিরোনামের একটি বার্ষিক প্রতিবেদনে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ইতালির জনসংখ্যার চিত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন, যা দেশের শ্রমবাজার, উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
৬.৫ মিলিয়নের বেশি ইতালিয়ান এখন বিদেশে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিদেশে বসবাসরত ইতালিয়ানদের নিবন্ধন ব্যবস্থায় নিবন্ধিত নাগরিকের সংখ্যা ৬৪ লাখ ১২ হাজার ৭৫২ জন। অপরদিকে, ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর জানায়, দেশে বসবাসরত মোট বিদেশির সংখ্যা ৫৪ লাখ ২২ হাজার ৪২৬ জন। অর্থাৎ বিদেশে থাকা ইতালিয়ানদের সংখ্যা এখন অন্তত ১০ লাখ বেশি।
মোট ইতালীয় নাগরিক (শুধু ইতালীয় পাসপোর্টধারী) বিবেচনায় প্রতি ১০০ জনে ১২ জন বর্তমানে দেশের বাইরে বাস করেন, যা ইতালির ইতিহাসে নজিরবিহীন।
২০ বছরে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি ও স্থায়ী মাইগ্রেশন প্রবণতা
২০০৬-এর পর থেকে ইতালিয়ানদের নিবন্ধন ব্যবস্থায় নিবন্ধনের হার ক্রমাগত বেড়েছে। শুধু গত বছরেই নিবন্ধন বেড়েছে ২.৭৮ লাখ, তিন বছরে ৪.৮ লাখ, ২০২৪ সালে রেকর্ড ১ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩২ জন ইতালিয়ান দেশ ছেড়েছে
মাইগ্রান্তেস বলছে, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা প্রায় থামছেই না। ইতালির শ্রমবাজারে স্থায়ী চাকরির সংকট, আঞ্চলিক বৈষম্য, তরুণদের জন্য সুযোগের অভাব ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া, এই কারণগুলো বিদেশমুখী প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
ইউরোপই প্রধান গন্তব্য
বিদেশে যাওয়া ৭৬ শতাংশ ইতালিয়ান ইউরোপকেই গন্তব্য হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এরমধ্যে শীর্ষ তিন দেশ হলো, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ড।
প্রতিবদেনটিতে আরও বলা হয়েছে, অভিবাসন এখন ‘চক্রাকার’ হয়ে উঠেছে, মানুষ যায়, ফিরে আসে, আবার যায়। এ ধারা শ্রমবাজারকে আরো অনিশ্চিত করছে।
নারী ও ৫০–এর বেশি বয়সীদের বিদেশমুখী প্রবণতা বাড়ছে
গত ২০ বছরে বিদেশে থাকা ইতালিয়ান নারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২.১৬ গুণ। এছাড়া ৫০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিক, বিশেষ করে দাদা–দাদি/নানা–নানিরা, সন্তান ও নাতি–নাতনির কাছে বিদেশে গিয়ে স্থায়ী হচ্ছেন।
ইতালির ‘একুশতম অঞ্চল’ দ্রুত বড় হচ্ছে
বিদেশে থাকা ইতালিয়ানদের বিশাল জনসংখ্যাকে অনেকেই ইতালির ২১তম অঞ্চল বলে থাকেন। মাইগ্রান্তেস বলছে, শুধু সংখ্যা নয়, বিদেশে থাকা ইতালিয়ানদের সামাজিক এবং পেশাগত কাঠামোও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ-উচ্চশিক্ষিত দক্ষ, তরুণ প্রতিভাবান ও যোগ্য মানুষদের অন্য দেশে চলে যাওয়া, দক্ষ পেশাজীবীদের ইউরোপে স্থায়ী হওয়া ও দক্ষিণ ইতালি থেকে ব্যাপক জনশূন্যতা
নেট ক্ষতি ও আঞ্চলিক বৈষম্য
২০০৬–২০২৪ সালে বিদেশে গেছে ১৬ লাখ ইতালিয়ান, ফিরেছে ৮.২৬ লাখ, ফলে ইতালির নেট জনসংখ্যার ক্ষতি ৮.১৭ লাখ, যা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, লোম্বার্ডি, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে।
বিদেশিদের প্রবেশ ও অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য
২০১৯ সালে বিদেশে থাকা ইতালিয়ান এবং ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি, দুই দলের সংখ্যাই ছিল ৫.৩ মিলিয়ন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালিতে অভিবাসীর প্রবেশ হার কমে গেছে, যা দেশের জনসংখ্যা ভারসাম্য আরও খারাপ করছে।
জনসংখ্যার ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতালির দ্রুত বার্ধক্য, জন্মহার কমে যাওয়া, তরুণদের বিদেশে যাওয়া এবং কম বিদেশি প্রবেশ, সব মিলিয়ে দেশটির জনসংখ্যা কাঠামো ঝুঁকির মুখে।
