বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইতালির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভাজনের চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জনমত জরিপ সংস্থা ‘ইউট্রেন্ড’এর সর্বশেষ জরিপ বলছে, দেশটির দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষের মধ্যে ডানপন্থী দলগুলোর জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, বিপরীতে উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণির সমর্থন ঝুঁকছে মূলত বামপন্থী দলগুলোর দিকে।

দরিদ্রদের মধ্যে মেলোনিও সালভিনির আধিপত্য

জরিপ অনুযায়ী, ইতালির দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি’র দল ‘ব্রাদার্স অফ সর্বোচ্চ জনপ্রিয়, সমর্থনের হার ৩১.১ শতাংশ। একই শ্রেণির মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমর্থন ধরে রেখেছে মাত্তেও সালভিনি’র নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী দল ‘লিগা’।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অভিবাসন বিরোধিতা, জাতীয়তাবাদী বক্তব্য এবং ‘এলিট-বিরোধী’ রাজনৈতিক ভাষাই মূলত এই দলগুলোর শক্তি। অর্থনৈতিক সংকট, কাজের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষ এসব দলকে নিজেদের কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখছে।

আয়ের সঙ্গে সঙ্গে কমছে লিগার ভোট

জরিপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আয়ের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লিগা দলের জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া। দরিদ্রদের মধ্যে যেখানে লিগার সমর্থন ১৪.৫ শতাংশ, সেখানে ধনী শ্রেণির মধ্যে তা মাত্র ৩.১ শতাংশে নেমে এসেছে ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে লিগার রাজনৈতিক আবেদন মূলত অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উচ্চ আয়ের ও করদাতা শ্রেণির কাছে দলটির নীতিগত অবস্থান খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়।

পিডি: দরিদ্রদের থেকে দূরে, শিক্ষিতদের কাছে জনপ্রিয়

বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ইতালির প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডি)-এর ক্ষেত্রে। জরিপ অনুযায়ী, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মধ্যে দলটির সমর্থন মাত্র ১২ শতাংশ। তবে উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে পিডির জনপ্রিয়তা প্রায় ৩০ শতাংশ।

বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন, নাগরিক অধিকার, ইউরোপপন্থী নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলো শহুরে ও শিক্ষিত ভোটারদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও, দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সংকটে থাকা মানুষের কাছে তা অনেক সময় বাস্তব সমস্যার সমাধান হিসেবে ধরা পড়ে না।

দক্ষিণ ইতালি ও পেরিফেরিতে ডানপন্থী ভোটব্যাংক

জরিপে আরও দেখা গেছে, দক্ষিণ ইতালি এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর ভর করেই ডানপন্থী দলগুলো এবং ফাইভ স্টার মুভমেন্ট  তাদের ভোটব্যাংক ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে শহরের বাইরের এলাকা বা শহরতলীতে ডানপন্থী ও ফাইভ স্টার মুভমেন্টের প্রভাব প্রায় একচেটিয়া। এসব এলাকায় বেকারত্ব, সরকারি সেবার ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত পিছিয়ে পড়া দীর্ঘদিনের সমস্যা।

শহরের কেন্দ্রে বামপন্থীদের দাপট

অন্যদিকে, শহরের অভিজাত ও কেন্দ্রস্থল এলাকাগুলো, যেগুলো ইতালিতে সীমিত যান চলাচল এলাকা (জিটিএল) নামে পরিচিত, সেখানে বামপন্থী দলগুলোর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। উন্নত শিক্ষা, স্থিতিশীল চাকরি ও সামাজিক সুবিধাভোগী এই শ্রেণি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ইউরোপীয় মূল্যবোধকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

ফোরজা ইতালিয়া: সব শ্রেণিতে স্থিতিশীল

এই শ্রেণিভিত্তিক বিভাজনের মধ্যেও ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে এসেছে সিলভিও বার্লুসকোনি, প্রতিষ্ঠিত ‘ফোরজা ইতালিয়া’। জরিপ বলছে, দলটি ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে মোটামুটি সমান ও স্থিতিশীল সমর্থন (৮.৬ শতাংশ) ধরে রাখতে পেরেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপন্থী অবস্থান এবং চরম বক্তব্য এড়িয়ে চলাই দলটির এই স্থিতিশীলতার কারণ।

রাজনৈতিক বিভাজনের ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জরিপ ইতালির রাজনীতিতে একটি গভীর সতর্কবার্তা বহন করছে। যদি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষ নিজেদের রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন মনে করে, তাহলে জনতাবাদী ও চরমপন্থী রাজনীতির উত্থান আরও জোরালো হতে পারে।

একই সঙ্গে বামপন্থী দলগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে তারা শহরের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে শহরতলী ও নিম্নআয়ের মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলোকে রাজনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রে আনতে পারে।ইতালির রাজনীতি তাই এখন শুধু দলীয় প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে শ্রেণি, আয় ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে পড়া সমাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version