বুধবার, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬   |   ২৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আগামীকাল ৩০ জানুয়ারি ইতালির পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘রি-মাইগ্রেশন’ বা অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো বিষয়ক এক বিতর্কিত সম্মেলন। আয়োজক কট্টর ডানপন্থী লীগ ‘লেগা’ দলের সংসদ সদস্য ডোমেনিকো ফার্গিউয়েল। কিন্তু এই সম্মেলনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই ইতালিজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক।

কারণ, এই আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ইতালির পরিচিত চরম ডানপন্থী ও নব্য-ফ্যাসিস্ট সংগঠন, কাসাপাউন্ড, ফোরজা নুওভা এবং স্কিনহেড আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের। এসব সংগঠন অতীতে বর্ণবাদ, সহিংসতা, মুসলিম ও অভিবাসীবিরোধী প্রচারণা এবং মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী আদর্শ পুনরুজ্জীবনের অভিযোগে একাধিকবার আলোচনায় এসেছে।

ইতালির পার্লামেন্ট শুধু একটি আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী সংবিধান ও প্রজাতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক। ১৯৪৮ সালের সংবিধান স্পষ্টভাবে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ নিষিদ্ধ করে। এই বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলোর প্রশ্ন, ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারার প্রতিনিধিরা কীভাবে পার্লামেন্টে জায়গা পায়?

চেম্বার অব ডেপুটিজের স্পিকার লরেঞ্জো ফন্টানা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠানটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানালেও আয়োজক ফার্গিউয়েল তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দাবি করেন, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। কিন্তু সমালোচকদের মতে, গণতন্ত্র ধ্বংসের আদর্শকে গণতন্ত্রের ছাতার নিচে জায়গা দেওয়া আত্মঘাতী।

 ‘রি-মাইগ্রেশন’ শব্দটি ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক মহলে বহুল ব্যবহৃত একটি ধারণা। এর মূল বক্তব্য হলো, শুধু অবৈধ নয়, বরং বৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসীদেরও সরকারি সহায়তায় স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই তথাকথিত ‘স্বেচ্ছা’ আসলে সামাজিক চাপ, বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে তৈরি করা বাধ্যবাধকতা।

সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য একটি ১০ দফা কর্মসূচি প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি কেন্দ্রীয় ‘বহিষ্কার রেজিস্ট্রি’ বহিষ্কৃত ও ‘অপ্রয়োজনীয়’ অভিবাসীদের তালিকা সংরক্ষণ, এনজিও পরিচালিত অভিবাসী উদ্ধার জাহাজের ইতালীয় জলসীমায় প্রবেশ নিষিদ্ধ, আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া আরও সীমিত ও কঠোর করা, সামাজিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশিদের জন্য বাড়তি শর্ত ও বৈধ অভিবাসীদের জন্য ‘স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন প্যাকেজ’। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রস্তাব ইতালির সংবিধান, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ ও জেনেভা কনভেনশনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

ইতালির ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, বামপন্থী জোট এবং একাধিক নাগরিক অধিকার সংগঠন এই সম্মেলনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। এক বিরোধী সাংসদ বলেন, পার্লামেন্টে নাৎসি-ফ্যাসিস্টদের প্রবেশ মানে ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এই সম্মেলন ভবিষ্যতে আরও কঠোর ও বৈষম্যমূলক আইন প্রণয়নের মঞ্চ তৈরি করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইতালির এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন প্রশ্নে কট্টর ডানপন্থীরা মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকে পড়ছে। ‘রি-মাইগ্রেশন’ ধারণাটি এখন শুধু প্রান্তিক মতাদর্শ নয়; বরং নীতিনির্ধারণী আলোচনায় ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে, যা ইউরোপের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য এক গভীর সতর্ক সংকেত।

এই বিতর্কের সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইতালিতে বসবাসরত লাখো অভিবাসীর ওপর, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি, উত্তর আফ্রিকান ও পূর্ব ইউরোপীয় নাগরিক রয়েছেন। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আজ ‘অপরাধী অভিবাসী’, কাল হয়তো ‘অপ্রয়োজনীয় অভিবাসী’।

৩০ জানুয়ারির সম্মেলন শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হলে, তা শুধু একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়; বরং এটি হয়ে উঠবে, ইতালির গণতন্ত্রের সহনশীলতার পরীক্ষা, ইউরোপে অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী মূল্যবোধের শক্তি যাচাইয়ের মুহূর্ত।

বিশ্লেষকদের ভাষায়, ইতালির পার্লামেন্টে ‘রি-মাইগ্রেশন’ বিতর্ক আসলে একটি প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে। ইউরোপ কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছে, নাকি সেই ইতিহাসই আবার ফিরে আসছে?

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version