ইতালির রাজধানী রোমে একই পরিবারের তিন বাংলাদেশি নাগরিককে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৯ বছর বয়সী এক শিশু কন্যাও রয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৯টার দিকে রোম শহরের পশ্চিমাঞ্চলের কাসালোত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিলিও সড়কের একটি ফ্ল্যাটের (অ্যাপার্টমেন্ট) ভেতর এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন—নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হৃদয়নগর এলাকার কামাল উদ্দিন বাবুল (৫০), তাঁর স্ত্রী হোসনে জাহান মমতাজ ওরফে আরজু (৪০) এবং তাঁদের ৯ বছর বয়সী ছোট মেয়ে আরিশা। ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ছোট্ট শিশু আরিশার গলা কেটে মৃত্যু হয়। নিহত কামাল উদ্দিন বাবুল প্রায় ১২ বছর আগে ইতালিতে যান এবং ৪-৫ বছর আগে স্ত্রী ও সন্তানদের নিজের কাছে নিয়ে যান।
এই ভয়াবহ হামলায় কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচে গেছেন বাবুল-আরজু দম্পতির ২০ বছর বয়সী ছেলে অয়ন। তিনি বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় ইতালির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অয়নের শরীরেও ছুরির গভীর আঘাত রয়েছে; তবে বর্তমানে তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি আশঙ্কামুক্ত।
স্থানীয় গণমাধ্যম ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে ওই বাংলাদেশি পরিবারের ওপর হঠাৎ অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীর এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে কামাল উদ্দিন বাবুল, তাঁর স্ত্রী ও ছোট মেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ সময় নিজের প্রাণ বাঁচাতে বাসা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড়ে বেরিয়ে প্রতিবেশীদের কাছে সাহায্য চান বড় ছেলে অয়ন। কিন্তু নিষ্ঠুর হামলাকারী পেছনে তাড়া করে তাকেও ছুরিকাঘাত করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পরে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স এবং ইতালির বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী ‘কারাবিনিয়ারি’-র সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। এই ঘটনার পর পুরো কাসালোত্তি এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং রোম পুলিশ ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
ইতালির প্রধান সংবাদ সংস্থা ‘আনসা’ ও ‘এজিআই’ জানিয়েছে, নিহতরা সবাই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তবে কী কারণে এই পরিকল্পিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তারা। এটি কোনো পূর্ব শত্রুতা, ডাকাতির চেষ্টা নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে—তার সব দিকই খতিয়ে দেখছে পুলিশ। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, এই বাংলাদেশি পরিবারের বিরুদ্ধে আগে কোনো ধরনের অপরাধের রেকর্ড ছিল না, তারা অত্যন্ত শান্তিমতো বসবাস করতেন।
বর্তমানে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছেন এবং তদন্তের স্বার্থে ফ্ল্যাটটি পুরোপুরি ঘিরে রাখা হয়েছে। খুনিকে শনাক্ত করতে ভবনের আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। রোম পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ। অপরাধীকে দ্রুত গ্রেফতার করতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালাচ্ছি।”
পুলিশ প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করছে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পরিবারের পরিচিত বা কোনো পারিবারিক বন্ধু জড়িত থাকতে পারেন। তবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এবং ঘাতক ধরা না পড়া পর্যন্ত তদন্তের সব তথ্য গোপন রাখছে পুলিশ।
তথ্যসূত্র: সময় টিভি
