ইতালির রাজধানী রোমে বিদেশি নাগরিকদের অধিকার, অংশগ্রহণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে আন্তঃসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের স্থায়ী পরামর্শ পরিষদ। এতে সাতটি বাংলাদেশি সংগঠনসহ মোট ৭৪টি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে।
রোম মহানগর এলাকার বিদেশি কমিউনিটিগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করা, সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং সামাজিক নীতি প্রণয়নে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে গঠন করা হয়েছে Consulta Permanente della Convivenza Interculturale বা আন্তঃসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের স্থায়ী পরামর্শ পরিষদ।
সম্প্রতি রোম মহানগর প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যালয়ে পরিষদটির প্রথম উন্মুক্ত অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন রোমের মেয়র ও রোম মহানগর এলাকার মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি।
আয়োজকেরা জানান, নাগরিক, বিভিন্ন সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন, তৃতীয় খাতের সংস্থা এবং বিদেশি কমিউনিটির দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফল এই পরিষদ। এর মাধ্যমে বিভিন্ন কমিউনিটির সঙ্গে প্রশাসনের নিয়মিত সংলাপ ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।
রোম ও এর আশপাশের মহানগর এলাকায় বসবাসরত ৬ লাখ ৮০ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিকের সেবার মান উন্নয়ন এবং তাঁদের অধিকার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে পরিষদটি।
২০২৩ সাল থেকে প্রস্তুতি
পরামর্শ পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে ২০২৩ সাল থেকে অংশগ্রহণমূলক কার্যক্রম শুরু হয়। এ প্রক্রিয়ায় নয়টি কর্মদল কাজ করেছে। এতে শত শত সহযোগী এবং বিদেশি কমিউনিটির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিভিন্ন সংগঠন অংশ নেয়।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, আবাসননীতি এবং অভ্যর্থনা ও আশ্রয়ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এসব আলোচনার ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিকদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও বিভিন্ন সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর উপায় খোঁজা হয়েছে।
পরিষদটির কাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতা, আবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অংশগ্রহণ জোরদার করা।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ে শিশুদের অন্তর্ভুক্তি, তাদের অধিকার সুরক্ষা এবং বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও কাজ করবে পরিষদটি।
যুক্ত হয়েছে সাত বাংলাদেশি সংগঠন
পরিষদটির প্রথম উন্মুক্ত অধিবেশনে ৭৪টি সদস্য সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। রোম ক্যাপিটালের প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব যুক্ত করলে সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫টি।
এতে যুক্ত সাতটি বাংলাদেশি সংগঠন হলো—
বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন অ্যাসোসিয়েশন (বিমাস)
ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব রোম
মুসলিম কমিউনিটি সেন্টার
অ্যাসোসিয়েশন কালচারালে ইসলামিকা দেল বাংলাদেশ আল আকসা
উলামা কাউন্সিল অব ইতালি
সঞ্চারী সঙ্গীতায়ন
সর্বজনীন শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির
অনুষ্ঠানে রোমের মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি, রোম মহানগর পরিষদের কাউন্সিলর তিজিয়ানা বিয়োলঘিনি, রোম ক্যাপিটালের সিটি কাউন্সিলের সভাপতি স্বেতলানা চেল্লি, জাতিগত বৈষম্যবিরোধী ইতালীয় জাতীয় দপ্তর (ইউএনএআর)-এর পরিচালক মাত্তিয়া পেরাদোত্তো এবং ইকুয়েডর ও সিয়েরা লিওনের কনসালসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া এআরসিআই রোমা, আনলফ, স্লো ফুড রোমা, কমিউনিটি সিয়েরা লিওন নিউ জেনারেশনস এবং অ্যাসোসিয়েশন কমিউনিটি পেরুভিয়ানার মতো সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
‘অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অপরিহার্য উপাদান’
মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি বলেন, এই পরামর্শ পরিষদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এটি শুধু মানুষের কথা শোনার জায়গা নয়; বরং ধারাবাহিক আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে বর্তমান সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি প্রণয়নের একটি স্থায়ী প্রক্রিয়া।
রোম দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মিলনস্থল উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মাধ্যমে কাজে লাগাতে হবে। এর মাধ্যমে পারস্পরিক স্বীকৃতি, সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মেয়র আরও বলেন, সংলাপ, যৌথ দায়িত্ববোধ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে সহাবস্থান গড়ে তুলতে এই পরিষদ রোম মহানগর প্রশাসনের অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করবে। তাঁর মতে, কমিউনিটির অংশগ্রহণ কোনো অতিরিক্ত বিষয় নয়; বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের গুণমান ও কার্যকারিতার অপরিহার্য উপাদান।
বিদেশি কমিউনিটির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতের লক্ষ্য
রোম মহানগর পরিষদে সমান সুযোগ, সামাজিক নীতি, সংস্কৃতি ও অংশগ্রহণবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলর তিজিয়ানা বিয়োলঘিনি বলেন, নাগরিকদের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নীতি গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তিনি জানান, প্রায় তিন বছর আগে মেয়র গুয়ালতিয়েরির সঙ্গে এ উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু হয়। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংগঠনকে একত্র করে এমন একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে, যা বাস্তব ও অনুভূত বৈষম্য দূর করতে এবং বিদেশি নাগরিকদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।
বিয়োলঘিনি বলেন, রোম ও আশপাশের এলাকাকে এমন একটি স্থানে পরিণত করতে হবে, যেখানে বিদেশি কমিউনিটিগুলো সরকারি সেবা, উন্নয়নের সুযোগ এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলোতে পূর্ণ প্রবেশাধিকার পাবে। পাশাপাশি শহরের নাগরিক জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিস্থিতি এবং অভিবাসী ও বিদেশি কমিউনিটির অধিকার সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে রোমকে সত্যিকার অর্থে বহুসাংস্কৃতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর মতে, নতুন এই পরিষদ শুধু অংশগ্রহণের একটি প্রতিষ্ঠান নয়; বরং আন্তঃসাংস্কৃতিক সহাবস্থান নিয়ে কাজ করা অসংখ্য নারী ও পুরুষের দীর্ঘদিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বিদেশি কমিউনিটি ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর জন্য স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
সংবাদ: মিনহাজ হোসেন, ইতালি


