জ্বালানি ও বিদ্যুতের চড়া দাম নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন পর্তুগালের সাধারণ মানুষ। ফরাসি এক সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ জ্বালানির দাম নিয়ে চিন্তিত এবং ৭৭ শতাংশ মানুষের ভীতি রয়েছে জ্বালানি তেলের খরচ নিয়ে। এই অতিরিক্ত খরচের চাপ মেটাতে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ তাদের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খরচ কমাতেও বাধ্য হচ্ছেন।
ফরাসি সংহতি সংস্থা ‘সেকুর পপুলার ফ্রঁসে’-এর করা দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিষয়ক ২০তম বার্ষিক ব্যারোমিটার প্রতিবেদনে জ্বালানি দারিদ্র্যকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার অন্যতম প্রধান রূপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০টি দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষ তাদের বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলকে উচ্চ বলে মনে করেন, যার মধ্যে ২০ শতাংশ এটিকে ‘অত্যন্ত উচ্চ’ বলে শ্রেণিভুক্ত করেছেন।
পর্তুগালের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৬৮ শতাংশ মানুষ এই খরচগুলোকে উচ্চ বলে মনে করলেও, ৮৫ শতাংশ নাগরিকই বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের পরিমাণ নিয়ে সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে মলদোভায় (৯৫ শতাংশ), এর পরেই রয়েছে গ্রিস (৯২ শতাংশ), ইতালি (৮৯ শতাংশ), রোমানিয়া ও সার্বিয়া (৮৮ শতাংশ)। এছাড়া ফ্রান্সে ৮৬ শতাংশ মানুষ জ্বালানি বিল নিয়ে উদ্বিগ্ন।
জ্বালানি তেল বা পেট্রোল-ডিজেলের খরচও মানুষের বাজেটে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। পর্তুগালে ৭৭ শতাংশ মানুষ পেট্রোল বা ডিজেল বাবদ খরচ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা ইউরোপের গড় হার (৭৩ শতাংশ)-এর চেয়ে বেশি এবং সমীক্ষিত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয়। জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে এই উদ্বেগ গ্রিসে ৮৪ শতাংশ এবং ইতালিতে ৮২ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে ৬৩ শতাংশ এবং জার্মানিতে এই হার ৬৪ শতাংশ।
এই বিপুল ব্যয়ের বোঝা সামাল দিতে অনেক পরিবারকে জ্বালানি এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হচ্ছে। ইউরোপের ৩৮ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, গত ১২ মাসে তারা জ্বালানি বিল পরিশোধের জন্য খাবার বা চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ খরচ বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন। পর্তুগালে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন ২৮ শতাংশ মানুষ, যেখানে মলদোভায় এই হার ৬৮ শতাংশ এবং গ্রিসে ৬২ শতাংশ। সর্বনিম্ন হার দেখা গেছে যুক্তরাজ্যে (২৫ শতাংশ) এবং জার্মানিতে (২৩ শতাংশ)।
জ্বালানি তেলের খরচ মেটাতে গিয়েও ইউরোপের ৩৪ শতাংশ মানুষকে অন্য গুরুত্বপূর্ণ খরচ ত্যাগ করতে হয়েছে। পর্তুগালে এই অনুপাত ৩০ শতাংশ। খরচ কমাতে ৬৮ শতাংশ ইউরোপীয় গত এক বছরে অন্তত একটি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং ৫৩ শতাংশ একাধিক কৌশল অবলম্বন করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত উপায় হলো ঘরের কোনো কোনো রুমের হিটার বন্ধ রাখা (৫২ শতাংশ), ঘরের তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে সীমিত রাখা (৪১ শতাংশ) এবং ওভেন বা ওয়াশিং মেশিনের মতো নির্দিষ্ট কিছু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার বন্ধ রাখা (৪১ শতাংশ)।
পর্তুগালের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ মানুষ ঘরের কিছু রুমের হিটার বন্ধ রাখেন, ৩৮ শতাংশ তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রির নিচে নামিয়ে আনেন এবং ৪০ শতাংশ নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপ্লায়েন্স ব্যবহার বন্ধ রেখেছেন। এ ছাড়া ৩৩ শতাংশ মানুষ কম বা ঠান্ডা পানিতে গোসল করার মতো কৌশলও বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে, যেসব অভিভাবক ঘর পর্যাপ্ত ঠান্ডা বা গরম রাখতে পারেননি, তাদের ৭৪ শতাংশই এর নেতিবাচক প্রভাব সন্তানদের ওপর পড়ার কথা জানিয়েছেন, যা গ্রিস, মলদোভা এবং পর্তুগালের অভিভাবকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়েছে।
সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ দিন দিন খারাপ হচ্ছে বলে মনে করেন প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৭ জন ইউরোপীয়। বিভিন্ন সংস্থার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, পর্তুগালে বর্তমানে প্রায় ১৮ লাখ থেকে ৩০ লাখ মানুষ জ্বালানি দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, ইতালি, পোল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, মলদোভা, পর্তুগাল, রোমানিয়া এবং সার্বিয়া—এই ১০টি দেশের প্রতিটিতে ১,০০০ জন করে মোট ১০ হাজার মানুষের ওপর অনলাইন ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়।
