শুক্রবার, ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার চড়া ব্যয়ের চাপে থাকা নাগরিকদের কিছুটা স্বস্তি দিতে পেনশনভোগীদের জন্য এককালীন বিশেষ বোনাস এবং কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত আয়কর (আইআরএস) ছাড়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিচ্ছে পর্তুগাল সরকার। আজ বৃহস্পতিবার দেশটির মন্ত্রিসভায় (কাউন্সিল অব মিনিস্টার্স) এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।

অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১,৬১১ ইউরো পর্যন্ত মাসিক পেনশন পান এমন নাগরিকেরা আগামী ডিসেম্বর মাসে ১০০ থেকে ২০০ ইউরো পর্যন্ত বিশেষ বোনাস পাবেন। এ খাতে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় ৪০ কোটি (৪০০ মিলিয়ন) ইউরো। অন্যদিকে চাকুরিজীবীদের জন্য আয়ের ষষ্ঠ ধাপ পর্যন্ত আইআরএস করের হার কমানো হবে, যার পেছনে ব্যয় হবে আরও ৪০ কোটি ইউরো। প্রগতিশীল কর কাঠামোর কারণে উচ্চ আয়ের ব্র্যাকেটের লোকেরাও এর সুফল পাবেন। আগামী নভেম্বর মাস থেকেই এই কর ছাড় কার্যকর করা হবে। পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টিনিগ্রো জানিয়েছেন, এই ছাড়ের মূল লক্ষ্য হলো দেশের ‘মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সহায়তা করা’।

সম্প্রতি সরকারের বিরুদ্ধে আনা একটি অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ হওয়ার পর মধ্য-ডানপন্থি এডি (AD) জোট সরকার এই আর্থিক সুবিধার ঘোষণা দেয়। এর ঠিক আগের দিনই দেশটিতে ডিজেলের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড স্পর্শ করে এবং পেট্রোলের দামও ইউক্রেন যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সিনেস এলাকায় অবস্থিত গাল্প-এর তেল শোধনাগারের সামনে গাড়ি নিয়ে প্রতিবাদ মিছিলে ক্ষুব্ধ নাগরিকদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘পরিবারগুলো আর বইতে পারছে না’।

ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক জোয়াও রদ্রিগেজ দস সান্তোস সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘যাঁদের প্রয়োজন তাঁদের কাছে অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া’ হিসেবে ইতিবাচক মনে করলেও পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাজেটের মাধ্যমে স্থায়ী ও কাঠামোগতভাবে নেওয়া উচিত, প্রতি বছর কোষাগারে টাকা থাকার ওপর নির্ভর করে নয়।

অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে সরকারের ভ্যাট আদায় বৃদ্ধি পাওয়ায় কোষাগারে পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে বলে জানান কর আইনজীবী তিয়াগো কাইয়াদো গেরেইরো। তিনি বলেন, ‘পণ্যের দাম বাড়ায় সরকার বেশি ভ্যাট পেয়েছে। সেই অতিরিক্ত রাজস্বের একটি অংশ আইআরএস কর ছাড়ের মাধ্যমে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত যৌক্তিক।’ সরকারি তথ্যমতে, জ্বালানি তেলের অতিরিক্ত মূল্য থেকেই সরকারের ভ্যাট আয় এসেছে প্রায় ৭০ কোটি ইউরো।

দুই বিশেষজ্ঞই একমত যে পর্তুগালে করের হার মাত্রাতিরিক্ত বেশি। আইনজীবী গেরেইরোর মতে, কঠোর কর কাঠামোর কারণে কর্মজীবীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অধ্যাপক রদ্রিগেজ দস সান্তোসও জটিল আয়কর ব্যবস্থার ধাপগুলো কমিয়ে একে সহজ করার ওপর জোর দেন।

এদিকে প্রধান বিরোধী দল সোশালিস্ট পার্টি (পিএস) এবং উগ্র ডানপন্থি দল শেগা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শূন্য ভ্যাট চালুর দাবি জানিয়ে আসছে। তবে আইনজীবী গেরেইরো সতর্ক করেছেন যে ভ্যাট কমানো প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল এবং এর ফলে যে স্থায়ী রাজস্ব ক্ষতি হবে, তা সরকার সহজে সামাল দিতে পারবে না। তাছাড়া ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো অর্থনৈতিক স্থবিরতা শুরু হলে রাজস্বের এই ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখাও সম্ভব হবে না। তবে অধ্যাপক রদ্রিগেজ মনে করেন, সার্বজনীনভাবে ভ্যাট হ্রাস সবচেয়ে কার্যকর হতে পারত, কারণ পর্তুগিজদের বড় অংশেরই আয় অত্যন্ত সীমিত।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি দিন দিন আরও প্রতিকূল হয়ে উঠছে। ফ্রাঙ্কফুর্টে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) সম্প্রতি সুদের হার আবার বাড়িয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সতর্কবার্তা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের দাম শিগগিরই আগের অবস্থায় ফিরবে না। আইনজীবী গেরেইরো বলেন, ‘আমরা এক বিরাট অস্থিরতার মধ্যে আছি; আমার মনে হয় এই সংঘাত শেষ হতে বহু বছর লেগে যাবে।’

প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টিনিগ্রো পর্তুগিজ অর্থনীতিকে ‘ইউরোপের সেরা অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স ও সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করলেও ইউরোস্ট্যাটের হিসাবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে পর্তুগাল জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে (০.৮%) সাইপ্রাসের সঙ্গে যৌথভাবে সপ্তম অবস্থানে ছিল।

বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র করের সাময়িক রদবদল সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান করতে পারবে না; কারণ পর্তুগালে সামাজিক নিরাপত্তায় নিবন্ধিত মোট কর্মজীবীদের প্রায় ৭৫ শতাংশেরই মাসিক বেতন ১,০০০ ইউরো বা তার নিচে।


শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version