সার্বিয়ায় সরকার পরিবর্তনের পর পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ প্রচার এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য দর্শকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে দেশটির একটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল।
সংবাদ উপস্থাপক গোরান এরর বলেন, বছরের পর বছর তাঁরা সাংবাদিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। অনেক ঘটনা নিয়ে নীরব থেকেছেন, একপক্ষের বক্তব্য প্রচার করেছেন এবং ক্ষমতাসীনদের প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করেননি।
উত্তর সার্বিয়ার ভয়ভদিনা প্রদেশের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম রেডিও টেলিভিশন ভোজভোদিনায় (আরটিভি) সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এরর বলেন, ‘আমরা নীরব থেকেছি, অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করেছি। একপক্ষীয় সংবাদ প্রচার করেছি এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে ব্যর্থ হয়েছি। এ জন্য দর্শকদের কাছে আমাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত।’
১২ বছর পর ক্ষমতার পালাবদল
সার্বিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছেন আলেক্সান্দার ভুসিচ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত এই নেতার দল সাম্প্রতিক নির্বাচনে বড় পরাজয়ের মুখে পড়েছে।
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ আন্দোলন নির্বাচনে ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। প্রায় সব ভোট গণনা শেষে ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে জোটটি প্রায় ১৪০টি আসন পেতে যাচ্ছে।
এতে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট না করেই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’।
প্রচলিত নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থাকা এই আন্দোলন চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করে সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছে।
সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
সরকার পরিবর্তনের পর দেশটির সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দূর করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যমেও পরিবর্তন আসতে পারে।
রেডিও টেলিভিশন ভোজভোদিনার ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক নেনাদ চাচিচ পদত্যাগ করেছেন। নির্বাচনের পর চ্যানেলটি সংবাদ সম্প্রচার শুরু করে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর বিজয় উদ্যাপনের দৃশ্য দিয়ে। আগের রাতে এসব দৃশ্য দেখানো হয়নি।
দেশটির শিক্ষার্থী আন্দোলন জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম রেডিও টেলিভিশন অব সার্বিয়ার (আরটিএস) শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও পদত্যাগ দাবি করেছে।
মঙ্গলবার এক চিঠিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, আরটিএসের মহাপরিচালক, তাঁর উপপ্রধান, সংবাদ পরিবেশনার দায়িত্বে থাকা প্রধান সম্পাদক এবং অন্যান্য সংবাদ সম্পাদকের পদত্যাগ করা উচিত।
তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী ও ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের লক্ষ্য করে অপমানজনক বক্তব্য প্রচার করা হলেও সম্প্রচারমাধ্যমটি সেগুলো যথাযথভাবে যাচাই না করে প্রচার করেছে।
বিক্ষোভের মুখে আরেক টিভি চ্যানেল
সোমবার সন্ধ্যায় সার্বিয়ার আরেকটি টেলিভিশন চ্যানেল ইনফরমার টিভির কার্যালয়েও প্রবেশ করেন বিক্ষোভকারীরা।
প্রায় ৩০ জন বিক্ষোভকারী চ্যানেলটির নিউজরুমে ঢুকে প্রধান সম্পাদক ও মালিক দ্রাগান ভুচিচেভিচকে ঘিরে ধরেন।
এ সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারী ‘এভাবেই স্বাধীন সার্বিয়া চলে’ এবং ‘ভুসিচ এখন কোথায়?’ বলে স্লোগান দেন। কেউ কেউ তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবিও জানান।
ভুসিচের দলের নির্বাচনি পরাজয়ের পেছনে গত দুই বছরের গণবিক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালে নোভি সাদ শহরে একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়।
আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীরা বারবার অভিযোগ করেন, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত আরটিএস তাঁদের বিক্ষোভের খবর যথাযথভাবে প্রচার করছে না।
নির্বাচনের রাতে ভুসিচ পরাজয় স্বীকার করার পর বেলগ্রেডে বিজয় উদ্যাপনে বিশাল জমায়েত হলেও সম্প্রচারমাধ্যমটি সেখানকার সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
সার্বিয়ার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে সার্বিয়ার অবস্থান ১০৪তম।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এটি দেশটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন অবস্থান। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বলকান অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে সার্বিয়ার অবস্থান সবচেয়ে খারাপ।
সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এই ক্ষমা প্রার্থনা তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনুশোচনার ঘটনা নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এর আগে হাঙ্গেরিতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। এপ্রিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের ফিদেস পার্টি নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার তিন মাস পর দেশটির প্রধান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল কালো পর্দায় ক্ষমা প্রার্থনার বার্তা দেখায়।
সেখানে লেখা ছিল, ‘গণমাধ্যম মিথ্যা বলতে পারে না। বহু বছর ধরে তা করার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।’


