যুক্তরাষ্ট্রের ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) বা গ্রিন কার্ড লটারি-২০২৭-এর নিবন্ধন চালুর নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা এই কর্মসূচির নিবন্ধন আবার শুরু হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশিরা এবার আবেদন করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
গত ১৪ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালত ডিভি-২০২৭ কর্মসূচির নিবন্ধন চালুর নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিবন্ধনের সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ের জন্য আবেদন গ্রহণ করতে হবে।
ফোর্বসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধন ২০২৫ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা স্থগিত করে। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর এক ঘোষণায় মন্ত্রণালয় জানায়, নিবন্ধন শুরুর তারিখ পরে জানানো হবে। তবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের ভিসা আবেদনের সময়সীমা ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল।
আদালতের সাম্প্রতিক নির্দেশে নিবন্ধন পুনরায় চালুর সুযোগ তৈরি হলেও সরকারের আপিল বা পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
কেন চালু হয়েছিল ডিভি লটারি
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৯০ সালের ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচি চালু হয়। যেসব দেশ থেকে তুলনামূলক কমসংখ্যক মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করেন, সেসব দেশের নাগরিকদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেওয়াই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের প্রচলিত ব্যবস্থায় পরিবারের সদস্য বা নিয়োগকর্তার মাধ্যমে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে আগে থেকে পারিবারিক বা পেশাগত যোগাযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ডিভি কর্মসূচি তুলনামূলক কম অভিবাসী পাঠানো দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য আলাদা একটি পথ তৈরি করে।
প্রতিবছর এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৫৫ হাজার ভিসা বরাদ্দ থাকে। তবে এই সংখ্যা শুধু মূল আবেদনকারীদের জন্য নয়। নির্বাচিত ব্যক্তিদের স্বামী বা স্ত্রী এবং যোগ্য সন্তানরাও এর আওতায় আসেন।
কেন নিবন্ধন স্থগিত ছিল
২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এ কারণে নিবন্ধন শুরুর তারিখ পরে ঘোষণা করা হবে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পরিবর্তনের কারণে নির্বাচিত ব্যক্তিদের ভিসা আবেদনের নির্ধারিত সময়সীমা পরিবর্তিত হওয়ার কথা ছিল না।
কিন্তু দীর্ঘ সময় নিবন্ধন শুরু না হওয়ায় কর্মসূচিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে রেড ঈগল ল নামের একটি আইনি প্রতিষ্ঠান ও আইনজীবী কার্টিস মরিসন সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেন।
তাঁদের যুক্তি ছিল, নিবন্ধনের সুযোগ না থাকলে আবেদনকারী পাওয়া যাবে না, লটারি আয়োজন করা সম্ভব হবে না এবং কার্যত ডিভি-২০২৭ কর্মসূচি অকার্যকর হয়ে পড়বে।
আদালত নিবন্ধন চালুর নির্দেশ দেন। তবে শুধু নিবন্ধন শুরু হলেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে না। আবেদন গ্রহণ, লটারিতে নির্বাচিত ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ এবং তাঁদের ভিসা প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। নিবন্ধনে বিলম্বের কারণে পরবর্তী ধাপগুলোও চাপে পড়তে পারে।
লটারিতে নির্বাচিত হলেই কি গ্রিন কার্ড পাওয়া যায়?
না। ডিভি লটারিতে নির্বাচিত হওয়া মানেই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার নিশ্চয়তা নয়।
নির্বাচিত ব্যক্তিদেরও যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। প্রধান আবেদনকারীর কমপক্ষে উচ্চমাধ্যমিক সমমানের শিক্ষা থাকতে হবে অথবা নির্দিষ্ট ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
সাধারণভাবে এ কর্মসূচিতে আবেদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চাকরির প্রস্তাব প্রয়োজন হয় না। তবে ভিসা দেওয়ার আগে আবেদনকারীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, আগের অভিবাসন আইন লঙ্ঘনসহ অন্যান্য অযোগ্যতার বিষয় যাচাই করা হতে পারে।
অর্থাৎ, ডিভি লটারি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ভিসা পাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পরও ভিসা পেতে নির্ধারিত আইনি ও প্রশাসনিক শর্ত পূরণ করতে হয়।
বাংলাদেশিরা কি এবার আবেদন করতে পারবেন?
ডিভি-২০২৭ নিয়ে বাংলাদেশিদের প্রধান প্রশ্ন এটিই। তবে এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে বাংলাদেশিরা এবার আবেদন করতে পারবেন কি না।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেশভিত্তিক যোগ্যতার তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে। আদালতের নির্দেশে নিবন্ধন চালুর পথ তৈরি হলেও তাতে বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ্য দেশের তালিকায় ফিরে আসেনি।
ফোর্বসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধন-সংক্রান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। সেই ঘোষণার পর বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের সুযোগ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
কেন ডিভি লটারিতে নেই বাংলাদেশ
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচির অযোগ্য দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, আগের পাঁচ বছরে কোনো দেশ থেকে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ দেশটিতে অভিবাসী হিসেবে গেলে সাধারণত সেই দেশের নাগরিকেরা ডিভি কর্মসূচিতে আবেদন করতে পারেন না।
বাংলাদেশিরা সর্বশেষ ২০১২ সালের ডিভি কর্মসূচিতে আবেদন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এরপর নির্ধারিত সীমার বেশি অভিবাসনের কারণে বাংলাদেশকে কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তী বছরগুলোর মার্কিন সরকারি নির্দেশনাতেও বাংলাদেশকে অযোগ্য দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে। ২০১৪ সালের ডিভি নির্দেশনাতেও বাংলাদেশ ওই তালিকায় ছিল।
তবে ডিভি কর্মসূচির যোগ্যতা প্রতি বছর পর্যালোচনা করা হয়। কোনো দেশের অভিবাসনের পরিসংখ্যান ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী দেশটির যোগ্যতার অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের করণীয়
আদালতের নির্দেশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশিদের ডিভি লটারিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ ফিরে আসা নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এসব তথ্য নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ডিভি লটারির নামে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া নিবন্ধন, অর্থ দাবি এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ঝুঁকি রয়েছে। তাই সরকারি ঘোষণা ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য সরবরাহ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
নিবন্ধন ও ফলাফলসংক্রান্ত তথ্যের জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট অনুসরণ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালত ডিভি-২০২৭-এর নিবন্ধন চালুর নির্দেশ দিলেও বাংলাদেশিদের আবেদনের সুযোগ নিশ্চিত হয়নি। দেশভিত্তিক যোগ্যতার তালিকা প্রকাশের পরই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বাংলাদেশ তালিকায় ফিরলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর দেশটি অযোগ্য থাকলে নিবন্ধন চালু হলেও বাংলাদেশিরা এ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন না।


