শনিবার, ৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ২১শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গত মাসে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতা-তে হাজার হাজার অভিবাসীর নজিরবিহীন অনুপ্রবেশের পেছনে মরক্কো সরকারের হাত থাকার কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ। তবে এই সংকটকে উসকে দিতে রাশিয়া, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক উগ্র ডানপন্থী চক্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

গত জুলাইয়ের শেষে সেউতা সীমান্তে প্রবেশের বিপজ্জনক চেষ্টায় অন্তত ১৪১ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রায় ৭০,০০০ পুরুষ, নারী ও শিশুর এই আকস্মিক অনুপ্রবেশ স্পেনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট তৈরি করেছে এবং অভিবাসন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

স্পেন সরকার আলজেরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করায় মরক্কো (রাবাত) অসন্তুষ্ট হয়ে প্রতিশোধ হিসেবে এই গণঅনুপ্রবেশের নাটক সাজিয়েছিল—এমন জল্পনাকল্পনা উড়িয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলেন, মরক্কো কর্তৃপক্ষের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ নেই।

সোমবার ‘কাদেনা সের’ রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মরক্কো কর্তৃপক্ষের জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকেই এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি যা সন্দেহ তৈরি করতে পারে। মরক্কোর সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অত্যন্ত ইতিবাচক। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, এই সংকট কেবল পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব—মরক্কোর প্রতি অবিশ্বাস দেখিয়ে নয়, যা সেউতার ইতিমধ্যেই অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে।’

সানচেজ অভিযোগ করেন যে—রাশিয়া, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক উগ্র ডানপন্থীদের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো থেকে পরিকল্পিতভাবে ভুল ও ভুয়া খবর ছড়ানো হয়েছিল, যারা সবসময় অভিবাসন ইস্যুকে ব্যবহার করে কেবল স্পেনের ওপরই নয়, বরং পুরো ইউরোপের ওপর আক্রমণ চালাতে চায়।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর এই অভিযোগের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদন সার একে একটি ‘নির্লজ্জ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই ধরনের কুৎসাপূর্ণ মিথ্যা ছড়িয়ে সানচেজ তাঁর দেশ পরিচালনায় নিজের লজ্জাজনক ব্যর্থতা আড়াল করতে পারবেন না।’

অন্যদিকে, ক্রেমলিনও সেউতা অভিবাসন সংকটের সঙ্গে রাশিয়ার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বলে সোমবার রুশ দৈনিক আরবিসি জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজ পুনর্ব্যক্ত করেন যে—এই অনুপ্রবেশের পেছনে মূলত কিছু ‘অপরাধী চক্র’ বা মানবপাচারকারী জড়িত ছিল, যারা গুজব ছড়িয়ে দাবি করেছিল—স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের এক রায় অনুযায়ী সাঁতার কেটে সেউতায় প্রবেশ করা কাউকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না। এই ভুয়া তথ্যে বিশ্বাস করেই হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিল।

অনুপ্রবেশকারীদের সিংহভাগই ইতিমধ্যে মরক্কোয় ফিরে গেলেও, এখনও ১,২০০ শিশুসহ অন্তত ৫,০০০ অভিবাসী সেউতার রাস্তায় ও সৈকতে রাত কাটাচ্ছেন। তাঁদের এই অবস্থানের কারণে স্থানীয় ক্ষুব্ধ বাসিন্দা ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে এবং সৈকতে ঘুমানো কিছু অভিবাসীর জিনিসপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত শনিবার স্প্যানিশ সেনাদের ওপর পাথর নিক্ষেপের দায়ে চার মরক্কোন অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজ আশ্বাস দিয়েছেন যে—সেউতায় আটকে পড়া এই মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য খুব শীঘ্রই ‘পর্যাপ্ত আবাসন সক্ষমতা’ তৈরি করা হবে।

তবে স্পেনের রক্ষণশীল দল ‘পিপলস পার্টি’ সেউতার জনগণকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে। দলের নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো বলেন, ‘৩০ জুলাইয়ের অনুপ্রবেশ রুখতে সরকার কিছুই করেনি এবং দিনে দিনে খারাপ হতে থাকা এই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও তারা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।’ 

অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থী দল ‘বক্স’-এর নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল এই ঘটনাকে ‘মরক্কো কর্তৃক পরিচালিত এবং সানচেজের সম্মতিতে হওয়া একটি সরাসরি আগ্রাসন ও যুদ্ধ ঘোষণা’ বলে অভিহিত করেছেন।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version