গ্রিসে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা আজ শুধুমাত্র একাধিক দেশ থেকে অভিবাসীদের ভিড়ে একটি অংশ নয়, বরং সেখানে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া একটি জীবন্ত বাংলাদেশি সম্প্রদায় হিসেবে দৃশ্যমান। এদেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে তারা কৃষিকাজ, সেবা খাত, হসপিটালিটি, নির্মাণসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করছেন, যেখানে তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক অবদান ও সামাজিক জীবন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জটিল অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
গ্রিসে আনুমানিক ২৫ হাজার এর মতো বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস করছেন বলে সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রে তথ্য জানা গেছে, যেখানে এদের কিছু অংশই বৈধভাবে নিবন্ধিত, আর অনেকে এখনও অবৈধ বা নিয়মিতকরণের অপেক্ষায় রয়েছেন।
২০১২ সালের পর থেকে ঢাকা ও এথেন্সের মধ্যে একটি মেমোরেনডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং, মাইগ্রেশন ও মবিলিটি অনুযায়ী অনিয়মিত অবস্থানকারী বাংলাদেশিরা বৈধ অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে পারছেন, যার ফলে ২০২৩ সালে প্রায় ৩ হাজার ৪০৫ জন বাংলাদেশিকে বৈধ স্থায়ী বসবাস বা রেসিডেন্স পার্মিট প্রদান করা হয়েছে, এবং হাজার হাজার আবেদন এখনও প্রক্রিয়াধীন।
এ রিপোর্টে আরও দেখা গেছে, ২০২৩ সালে মোট ১০ হাজার ৩৩৭ জন অনিয়মিত বাংলাদেশি নিয়মিতকরণ করার জন্য আবেদন করেছে, তবে এর অনেক আবেদন এখনও অপেক্ষমান অবস্থায় রয়েছে এবং নতুন আবেদনও নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে।
গ্রিসে বসবাসরত বাংলাদেশিরা মূলত, যেখানে শ্রমের চাহিদা খুব বেশি এবং যন্ত্রপাতির পরিবর্তে মানুষের পরিশ্রমের ওপর বেশি নির্ভরতা থাকে, এমন খাতে কাজ করছেন। বিশেষ করে গ্রিসের কৃষিখাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এথেন্সের নিওয় মানোলাদা, লাপা ও ভার্দা অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক কৃষিকাজে দিনরাত পরিশ্রম করে সারা মৌসুমের স্ট্রবেরি, ফল, ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাত করে, যেখানে তারা স্থানীয় অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করছেন।
এই শ্রমিকদের কাজের চরিত্র সাধারণত সিজনাল ও মৌসুমি ভিত্তিক, যেখানে আয় তুলনামূলক কম এবং সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা সীমিত। অনেকে ন্যূনতম মজুরির তুলনায় কম পারিশ্রমিক পান এবং সামাজিক অবস্থা অনেক সময় কম নিরাপদভাবে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী জীবনের দুশ্চিন্তা তৈরি করে।
এর পাশাপাশি গ্রিস সরকারের পরিকল্পনায় বাংলাদেশি কর্মীদের পুনরায় কৃষি, পর্যটন, হসপিটালিটি, নির্মাণ খাতে নিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনা গ্রিসে শ্রম বাজারে আরও বৈধ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
গ্রিসে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। এথেন্সে প্রকাশিত নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ভাষা, গান, নৃত্য এবং সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়, যেখানে স্থানীয় জনগণও অংশ নেন এবং দ্বি‑সাংস্কৃতিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়। বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের তরুণদের মধ্যে বাংলাদেশের ভাষা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি শিক্ষা দিয়ে একটি সংগঠন, ডইল একাডেমি গড়ে উঠেছে, যা প্রবাসী শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে ভূমিকা রাখছে।
আথেন্সের ওমানিয়া স্কয়ার সহ অন্যান্য এলাকায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সামাজিক মিলন ঘটে থাকে, যা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি “ছোট্ট বাংলাদেশ”‑র অনুভূতি তৈরি করে, যেখানে দেশ তাদের কাছে মনে হয় শুধুই এক ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং কমিউনিটির শক্তি, সম্পর্ক ও ভবিষ্যতের আশা‑আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
তবে এই “এক টুকরো বাংলাদেশ” শুধু আনন্দের গল্প নয়। অনিয়মিত অবস্থান, বৈধতার সীমাবদ্ধ সুযোগ, কম মজুরি, কাজের নিরাপত্তার অভাব এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব, এসব কারণে অনেক বাংলাদেশি প্রবাসী জীবনে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হন। একটি প্রতিবেদনেও উল্লেখ আছে যে অনেক অনিয়মিত অভিবাসী গ্রিস প্রশাসনের গ্রেপ্তার ও প্রতিরোধ কার্যক্রমের জন্য আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এবং বৈধতার সুযোগের অজানা শর্তগুলো তাদের জীবনে নতুন করে অসুবিধা তৈরি করছে।
এছাড়া অনেক দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন যে তাদের জীবনে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা কখনো কখনো পরিবারকে গ্রিসে আনতে পারা না, এটা সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈরি করছে, কারণ পরিবারের সদস্যরা আলাদা থাকায় দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় ও সহযোগিতার কাঙ্খিত নিরাপত্তা পায় না।
গ্রিসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য বাংলাদেশের দূতাবাস সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তারা প্রবাসীদের আইনি সহায়তা, নিবন্ধন কর্মসূচি ও সামাজিক উৎসব আয়োজন করছে এবং বিভিন্ন দিন অনুষ্ঠান করে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস উদযাপন করছে, যাতে গ্রিসে বসবাসকারীদের মধ্যে দেশরত্নতা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সহায়তা হয়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসে ঢাকার দূতাবাস “প্রবাসী সাংবাদিক ও রেমিট্যান্স প্রেরণকারী” বাংলাদেশি নাগরিকদের সম্মাননা দিয়েছিল, যা প্রবাসীদের গ্রিসীয় সমাজে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।
গ্রিসে বাংলাদেশিদের থাকার গল্প শুধু স্থায়ী কমিউনিটিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অনেকের জীবনে আরও ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদজনক যাত্রার অংশও রয়েছে। সম্প্রতি গ্রিস উপকূলে উদ্ধার হওয়া ৫৩৯ অভিবাসীর মধ্যে ৪৩৭ জনই বাংলাদেশি ছিল, যা প্রমাণ করে যে এখনও অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ পৌঁছাতে চাইছেন, যেখানে নিরাপত্তার অভাব ও অনিশ্চয়তার মাঝে বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে।
গ্রিস ও বাংলাদেশের মধ্যে চলমান মাইগ্রেশন চুক্তি ও কর্মসংস্থান সহযোগিতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। যেমন সরকার‑সমর্থিত কর্মী পাঠানো, বৈধ কর্মসংস্থান, নিরাপদ ও নিয়মিত সুযোগ বৃদ্ধি ইত্যাদি। তবে এই সুযোগগুলো বাস্তবে পরিণত হতে হলে কাগজপত্র, ভাষার দক্ষতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলোর ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশি কমিউনিটি‑এর জীবন, শ্রম ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে আজ গ্রিসে একটি “এক টুকরো বাংলাদেশ” গড়ে উঠেছে, এটি শুধু একটি ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং সাহস, সংগ্রাম ও আশার গল্প, যেখানে প্রবাসীরা নিজেদের বাস্তবতা ও সম্ভাবনার মাঝামাঝি চলছেন, এবং ভবিষ্যতের আরও উন্নত জীবন নির্মাণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।


