ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জুড়ে বসবাসরত নথিপত্রহীন বা অনিয়মিত অভিবাসীরা তাদের আইনত প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে মারাত্মক অনীহা প্রকাশ করছেন। জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের ফাঁকে উপস্থাপিত বহুজাতিক গবেষণা প্রকল্প ‘গ্রেস’ এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, ইউরোপের জটিল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে নথিপত্রহীন অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি অদৃশ্য কিন্তু ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হচ্ছে। মূলত জটিল আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি এবং চিকিৎসা নিতে গিয়ে অবৈধ বসবাসের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে লাখ লাখ মানুষ হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে দূরে থাকছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি দেশকে অভিবাসীদের মর্যাদা নির্বিশেষে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ডেনমার্কে যেমন আইনি বাসস্থান ছাড়া প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়াই অসম্ভব, সেখানে মানুষকে স্বেচ্ছাসেবীদের ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে হয়。 অন্যদিকে ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে চিকিৎসার সুযোগ থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হন। চেক প্রজাতন্ত্রে অভিবাসীরা স্থানীয় ডাক্তারদের এড়িয়ে নিজ দেশের চিকিৎসকদের সাথে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন। সবচেয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি জার্মানিতে; সেখানে চিকিৎসকেরা রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করলেও, সরকারি তহবিল ব্যবহারের সাথে সাথে সমাজসেবা দপ্তরকে নথিবিহীন ব্যক্তিদের তথ্য জানাতে হয়। ফলে অভিবাসীদের মধ্যে নির্বাসনের (ডিপোর্টেশন) একটি ব্যাপক ভীতি তৈরি হয়েছে।
নথিপত্রহীন অভিবাসীদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই বঞ্চনা জন্ম থেকেই শুরু হয়। ফ্রান্সে বহু নথিপত্রহীন মা জন্ম দেওয়ার পরপরই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। নথিপত্রহীন শিশুরা নিয়মিত টিকাদান, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও দাঁতের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা অনেক সময় অবহেলার পর্যায়ে চলে যায়। বিশেষ করে যেসব নাবালকের সাথে কোনো অভিভাবক নেই, তারা অপুষ্টি, গৃহহীনতা এবং যৌনকর্মসহ বিভিন্ন শোষণের শিকার হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন এই নাবালকদের বয়স ১৮ বছর পার হয়; তখন শিশুদের জন্য থাকা বিশেষ সুরক্ষা হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা প্রাপ্তবয়স্কদের জটিল নিয়মের বেড়াজালে হারিয়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্ক নথিপত্রহীন অভিবাসীরা ইউরোপে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। তাদের অনেকেই কয়েক দশক ধরে অনানুষ্ঠানিক খাতে হাড়ভাঙা শারীরিক পরিশ্রম করেছেন। দীর্ঘদিনের অচিকিৎসিত ব্যথা এবং অবহেলার কারণে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ত্বরিত বার্ধক্য’ বা দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। ইউরোপে স্বাস্থ্যসেবা যেহেতু বৈধ কাজ ও বসবাসের সাথে যুক্ত, তাই বয়স বাড়ার কারণে কাজ করার ক্ষমতা হারানোর সাথে সাথে তারা চিকিৎসার যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলছেন এবং চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
হাসপাতালে গেলে ধরা পড়ার ভয় থাকায় এই অভিবাসীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ মজুত করা, অনলাইন ফোরাম বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং দূরবর্তী উপায়ে চিকিৎসা নেওয়ার মতো অনানুষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন। এর ফলে পরবর্তীতে তারা যখন বৈধ নথিপত্র পান, ততদিনে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলিত রোগ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক আর্থিক ও চিকিৎসার চাপ তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর প্রতিনিধি ড্যানিয়েল মিক জানিয়েছেন, তথ্যের এই ঘাটতি পূরণ করে নথিপত্রহীন মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তারা ইইউ দেশগুলোর সাথে সংলাপ পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত। চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘গ্রেস’ প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো ইউরোপীয় সরকারগুলোর কাছে জমা দেওয়া হবে, যাতে এই অদৃশ্য মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধান করা যায়।
তথ্যসূত্র: ইনফো মাইগ্রেন্টস


