মরক্কো থেকে গত সপ্তাহে স্পেনের ছিটমহল সেউতায় হাজার হাজার অভিবাসীর আকস্মিক অনুপ্রবেশের পর ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এক জরুরি বৈঠকে বসছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
স্পেন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৯ হাজার ৫০০ জন অভিবাসী মরক্কোয় ফিরে গেছেন। যদিও প্রাথমিকভাবে এই সংখ্যা ৫০ হাজার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
এদিকে, এই সীমান্ত সংঘাতের জেরে স্পেনের সীমান্ত এলাকায় ৭২ জনের মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া মরক্কো সীমান্তে নিহত হয়েছেন আরও ১১ জন। সেউতার এই নজিরবিহীন ঘটনাটি ইইউ-এর ২৭টি সদস্য দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত সুরক্ষায় ‘সম্মিলিত পদক্ষেপ’ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজকে লেখা এক চিঠিতে তিনি এই সংকট মোকাবিলায় তাঁর ‘দ্রুত পদক্ষেপের’ প্রশংসা করেন।
ফন ডার লিয়েন আরও লিখেছেন, ‘এই ঘটনা থেকে এটি স্পষ্ট যে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আমাদের সীমান্তকে আরও শক্তিশালী করতে অবশ্যই আরও বেশি কাজ করতে হবে।’
অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে তিনি ইইউ-কে পাঁচটি ক্ষেত্রে ‘আগের চেয়েও অনেক বেশি জোরালো পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্ষেত্রগুলো হলো—সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে শুরুতেই অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ করা, বহিরাগত সীমান্ত আরও শক্তিশালী করা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কার্যকর করা, মানব পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা এবং অনুপ্রবেশকারীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা।
ইতালির শেনজেন স্থগিতাদেশ ও চেক প্রধানমন্ত্রীর দাবি
স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন সেউতা সীমান্তে অভিবাসীদের অনুপ্রবেশের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ইতালি স্পেনের সাথে তাদের শেনজেন চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। উল্লেখ্য, শেনজেন চুক্তির আওতায় ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত তল্লাশিহীন মুক্ত যাতায়াত ব্যবস্থা সচল রাখা হয়। বর্তমানে ইউরোপের ২৯টি দেশ এবং ৪৫ কোটিরও বেশি মানুষ এই চুক্তির আওতাভুক্ত।
ইতালির এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক। তবে চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ বাবিস আরও কড়া পদক্ষেপ নিয়ে স্পেনের শেনজেন সদস্যপদই সাময়িকভাবে স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইউরোপীয় দেশগুলোর এমন প্রতিক্রিয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ বলেন, কিছু ইউরোপীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে তাঁর ‘গভীর উদ্বেগ’ রয়েছে। একই সাথে সেউতা যে শেনজেন এলাকার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা-ও তিনি মনে করিয়ে দেন।
সানচেজ বলেন, সংকটের সময় বেশিরভাগ দেশ ‘সমর্থন ও সংহতি’ দেখালেও অন্য কয়েকটি ইউরোপীয় সরকার ‘কুসংস্কার, ভুয়া খবর, অজ্ঞতা অথবা রাজনৈতিক স্বার্থের বশবর্তী হয়ে’ স্পেনকে আক্রমণ করার পথ বেছে নিয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে ফন ডার লিয়েন সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমাদের বাইরের দিকের সব সীমান্ত রক্ষা করা ইউরোপের একটি যৌথ দায়িত্ব।’ একই সাথে তিনি ‘কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দৃশ্যমান বাধা ব্যবহারের’ আহ্বান জানান।
ইইউ প্রেসিডেন্ট বলেন, আগামী মঙ্গলবারের ভিডিও কনফারেন্সটি সেউতার ঘটনা থেকে ‘শিক্ষা’ নেওয়ার একটি বড় সুযোগ হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকিগুলো মোকাবিলার জন্য ‘একটি সাধারণ ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া, সম্মিলিত পদক্ষেপ এবং পারস্পরিক সংহতি প্রয়োজন।’
এদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ মানব পাচারকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছেন, তারা দেশের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের অন্যায্য সুযোগ নিচ্ছে। ওই রায়ের ফলে সমুদ্রপথে আসা অনুপ্রবেশকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছিল।
গত শনিবার স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্র্যান্ডে-মারলাস্কা জানান, পরিস্থিতি এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সাগর বা জলপথ দিয়ে নতুন করে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তাঁরা পানিতে ‘ইনফ্ল্যাটেবল ব্যারিয়ার’ বা বাতাসভর্তি বড় প্লাস্টিকের লম্বা প্রতিবন্ধকতা তৈরির কাজ শুরু করেছেন।


