সন্তান অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার বাবা-মা বা অভিভাবকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাজ্য সরকার। এর আওতায় বাবা-মাকে জরিমানা, সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা এমনকি চরম ক্ষেত্রে কারাদণ্ড দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
যুক্তরাজ্যের কিশোর বিষয়ক বিচারমন্ত্রী জেক রিচার্ডস বলেছেন, সমাজকে নিরাপদ রাখতে বাবা-মায়েরা যেন নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন, তা নিশ্চিত করতে তাদের আনুপাতিক ও পরিস্থিতি অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
সরকার বাবা-মায়ের জন্য দেওয়া ‘অভিভাবকত্বের নির্দেশনা’ আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা প্রকাশের পর তিনি এ কথা বলেন। এসব নির্দেশনার আওতায় বাবা-মা বা অভিভাবকদের সন্তানের আচরণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা হতে পারে। এর মধ্যে পরামর্শমূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া থেকে শুরু করে আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও অংশ নেওয়ার নির্দেশ থাকতে পারে।
নির্দেশনা না মানলে সর্বোচ্চ ১ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হতে পারে। তবে রিচার্ডস বলেছেন, বাবা-মাকে কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি ‘অত্যন্ত চরম পরিস্থিতির’ জন্য রাখা হবে এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বিচারক।
টাইমসকে রিচার্ডস বলেন, অভিভাবকত্বের নির্দেশনার মাধ্যমে তরুণ অপরাধীদের আচরণ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় বাবা-মায়েদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করা হবে। তবে এর সঙ্গে কিছু দায়িত্বও থাকবে।
তিনি বলেন, এর মধ্যে কারাদণ্ড বা সরকারি ভাতা বন্ধ করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও থাকতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা বিচারক নির্ধারণ করবেন।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনকে তিনি ‘পুরস্কার ও শাস্তি—দুইয়ের সমন্বিত’ পদ্ধতির অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে প্রস্তাবগুলোর সমালোচনা করেছেন অপরাধবিষয়ক বিচারব্যবস্থার অনেক বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, এ ধরনের নির্দেশনা কার্যকর নয় এবং এর ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিশুদের আচরণ নিয়ে গবেষণা করা এবং ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিকি রাটার জুলাইয়ে বিবিসিকে বলেন, অভিভাবকত্বের নির্দেশনা কার্যকর নয়—এমন প্রমাণের পরিমাণ অনেক। এ কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব নির্দেশনার ব্যবহার কমেছে।
তিনি বলেন, দারিদ্র্যের সঙ্গে অনেক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাবা-মাকে বেশি জরিমানা করা হলে তাদের হাতে আরও কম অর্থ থাকবে, যা পরিবারগুলোকে আরও বেশি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এর আগে মে মাসে তৎকালীন বিচারমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছিলেন, অভিভাবকত্বের নির্দেশনা আরও শক্তিশালী করার অর্থ হবে—যেসব বাবা-মা বা অভিভাবক ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তানের আচরণ সংশোধনের প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হন, তাদের জন্য বাস্তব পরিণতি থাকা।
তিনি বিবিসি ব্রেকফাস্টকে বলেছিলেন, কোনো পরিবার সমস্যায় পড়লে বিচারক হস্তক্ষেপ করতে পারবেন, যাতে তরুণ ব্যক্তি প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় এবং বাবা-মা নিজেদের সর্বোচ্চটা করার চেষ্টা করেন। তবে বাবা-মাকে কারাগারে পাঠানোর ক্ষমতা খুব কম ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
যুক্তরাজ্যের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালতকে তার বাবা-মায়ের জন্য অভিভাবকত্বের নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রেও আদালত এমন নির্দেশনা দিতে পারে, যদি তারা মনে করে এতে ভবিষ্যতে ওই কিশোরের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো সম্ভব হবে।
এ ধরনের নির্দেশনার মেয়াদ সর্বোচ্চ ১২ মাস হতে পারে। সাজা নির্ধারণবিষয়ক পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, অভিভাবকত্বের নির্দেশনা অমান্য করাও একটি ফৌজদারি অপরাধ। এর জন্য সর্বোচ্চ ১ হাজার পাউন্ড জরিমানা হতে পারে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের নির্দেশনা দেওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০০৯-১০ সালে যেখানে এক হাজারের বেশি অভিভাবকত্বের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, ২০২২-২৩ সালে তা কমে মাত্র ৩৩টিতে দাঁড়ায়।
কিশোর বিষয়ক বিচার ব্যবস্থা সাময়িকীতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন নিউ লেবার সরকার ব্যবস্থা চালুর পর থেকে এর ব্যাপক ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও অভিভাবকত্বের নির্দেশনার প্রভাব ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা খুবই সীমিত।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সহায়তামূলক কার্যক্রমে বাবা-মায়ের অংশগ্রহণ স্বেচ্ছামূলক হওয়া উচিত।


