স্পেনের মাদ্রিদ থেকে সেভিলেগামী রেলপথে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগে দুই ট্রেনের চালক ও রেল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের কথোপকথনের তিনটি অডিও রেকর্ডিং ফাঁস হয়েছে। এসব অডিওতে রেল চলাচল নিয়ন্ত্রণে গুরুতর ত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সামনে একটি ট্রেন আটকে থাকার পরও পেছনের ট্রেনটিকে স্বাভাবিক গতিতে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়।
স্পেনের রেল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ভুল সংকেত ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি দুর্ঘটনার কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
গত বুধবার স্থানীয় সময় সকালে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় আনদালুসিয়াকে সংযোগকারী রেলপথে দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রেন দুটি ছিল বেসরকারি অপারেটর আইরো ও রাষ্ট্রীয় অপারেটর রেনফের। আইরোতে ১৪৭ জন এবং রেনফেতে ৩৯৭ জন যাত্রী ছিলেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করে কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ ও বিস্তারিত তথ্য উদঘাটনে কর্তৃপক্ষ দিন-রাত কাজ করছে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইস ও আরটিভিই দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগে রেল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মকর্তা ও দুই ট্রেনের চালকের কথোপকথনের অডিও প্রকাশ করেছে। এসব রেকর্ডিংয়ে সিগন্যাল ব্যবস্থায় সমস্যার মধ্যেও ট্রেন চলাচলের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কম্পিউটার বিকল হয়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ও ট্রেন ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে মাদ্রিদ-সেভিল দ্রুতগতির রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় ওই লাইনে থাকা ছয়টি ট্রেন থেমে যায়। এর মধ্যে সামনে ছিল ১৪৭ জন যাত্রী নিয়ে আইরো ট্রেন। এর প্রায় ২৫ কিলোমিটার পেছনে ছিল ৩৯৭ জন যাত্রী নিয়ে রেনফে ট্রেন।
অডিওতে যা শোনা গেছে
একটি অডিওতে রেল নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের এক কর্মকর্তাকে পেছনে থাকা রেনফে ট্রেনের চালককে ট্রেনের গতি পর্যবেক্ষণব্যবস্থা বন্ধ করে আবার চালু করতে বলতে শোনা যায়। এরপর তিনি চালককে বলেন, ‘আপনার যাত্রা শুরু করুন এবং স্বাভাবিক গতিতে ট্রেন চালান।’
নির্দেশ শুনে চালক কিছুটা বিস্মিত হয়ে জানতে চান, ‘স্বাভাবিক গতিতে?’ জবাবে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে বলা হয়, ‘হ্যাঁ, স্বাভাবিক গতিতে।’
অন্য একটি অডিওতে সামনে থাকা আইরো ট্রেনের চালককে নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে যোগাযোগ করে জানাতে শোনা যায়, সিগন্যাল চলে যাওয়ায় তাঁর ট্রেনটি উর্দার দিকে যাওয়ার প্রবেশপথের সামনে আটকে আছে। নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে ওই ট্রেনকেও আবার চলার চেষ্টা করতে বলা হয়।
দুর্ঘটনার প্রায় পাঁচ মিনিট আগে আইরো ট্রেনের চালক আবার যোগাযোগ করেন। এ সময় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, ট্রেনের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোনোভাবেই কাজ করছে না এবং ট্রেনটি চালু করা যাচ্ছে না।
অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, সামনে থাকা ট্রেনটি অচল হয়ে আটকে থাকার তথ্য পাওয়ার পরও পেছনে থাকা রেনফে ট্রেনটিকে থামার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের নির্দেশ পেয়ে রেনফে ট্রেনটি ঘণ্টায় প্রায় ১২৪ মাইল গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। উর্দার কাছে রেলপথের ১১৮ কিলোমিটার পয়েন্টে বাঁক ঘুরতেই চালক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আইরো ট্রেনটিকে দেখতে পান। কিন্তু ততক্ষণে ট্রেনটির গতি এত বেশি ছিল যে ব্রেক করেও সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়নি। দ্রুতগতির রেনফে ট্রেনটি আইরোর পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়।
ধাক্কায় আইরো ট্রেনের পেছনের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে রেললাইনের পাশের বাঁধের নিচে ছিটকে পড়ে। দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯ জন নিহত হন। আহত হন শতাধিক মানুষ।
রেলপথের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটি থাকার পরও একটি ট্রেনকে স্বাভাবিক গতিতে চলার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি স্পেনের পরিবহণমন্ত্রীও জানিয়েছেন। নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের এমন সিদ্ধান্তকে ‘ব্যাখ্যাতীত’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
অডিও ফাঁস নিয়ে সমালোচনা
দুর্ঘটনার আগে দুই ট্রেনের চালক ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের কথোপকথনের অডিও ফাঁস হওয়ায় স্পেনের রাজনীতিকদের মধ্যে সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
বামপন্থি সুমার জোটের আইনপ্রণেতা আলবের্তো ইবানিয়েস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অডিও ফাঁসের ঘটনাকে নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেন।
পডেমোস দলের নেতা আইরেনে মনতেরো বলেন, দুর্ঘটনার দায় শুধু একজন কর্মীর ওপর চাপানো উচিত নয়। রেল খাতের বেসরকারীকরণ নিয়ে চালক ও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে অডিও রেকর্ডিংয়ে উঠে আসা তথ্য দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও, চূড়ান্ত দায় নির্ধারণে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।


