বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের অভিবাসন নীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর), আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসে জোটের নেতারা বাংলাদেশসহ সাতটি দেশকে ‘নিরাপদ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এর ফলে এসব দেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন যেমন দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে, তেমনি প্রত্যাখ্যাতদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পথও প্রশস্ত হলো।

ইইউ-এর নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাথমিক তালিকায় থাকা সাতটি দেশ হলো:  বাংলাদেশ, ভারত, মিশর, মরক্কো, টিউনিশিয়া, কলম্বিয়া ও কসোভো।

ইইউ-এর নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো দেশকে তখনই ‘নিরাপদ’ বলা হবে যখন সেখানে সশস্ত্র সংঘাত বা পদ্ধতিগত নিপীড়নের মতো পরিস্থিতি থাকবে না। তবে তুরস্ক, আলবেনিয়া এবং মন্টেনেগ্রোর মতো ইইউ সদস্যপদ প্রত্যাশী দেশগুলোকেও এই তালিকায় যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।

এই নীতিমালার ফলে নিরাপদ দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের আবেদন আর দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রাখা হবে না। বিশেষ কোনো কারণ বা প্রাণের ঝুঁকি প্রমাণ করতে না পারলে তাদের আবেদন সরাসরি বাতিল হতে পারে। ২০২৪ সালে গৃহীত এবং ২০২৫-এর জুনে কার্যকর হতে যাওয়া ‘অভিন্ন আশ্রয়নীতি’র অধীনে, আবেদন বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে। যদি কোনো দেশে হুট করে যুদ্ধ শুরু হয় বা ইইউ কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তবে ওই দেশের ‘নিরাপদ’ তকমা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হবে। ইউরোপীয় কমিশন নিয়মিত এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। জার্মানি বা ইতালির মতো দেশগুলো ইইউ তালিকার বাইরেও নিজস্ব প্রয়োজনে অন্য কোনো দেশকে ‘নিরাপদ’ ঘোষণা করার অধিকার রাখবে।

২০১৫ সালে ১০ লাখের বেশি শরণার্থী প্রবেশের পর থেকে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থী দলগুলোর প্রভাব বাড়ছে। ইতালির রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ আলেসান্দ্রো সিরিয়ানি মনে করেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইইউ তার সীমান্ত সুরক্ষায় এক দৃঢ় বার্তা দিয়েছে। এর ফলে প্রকৃত শরণার্থীদের চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং অর্থনৈতিক কারণে আসা অভিবাসীদের প্রবাহ কমানো সম্ভব হবে।

ইইউ-এর এই পদক্ষেপকে ‘অমানবিক’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতে এটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার এক নির্লজ্জ প্রচেষ্টা, যা অভিবাসীদের চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেবে।

ড্যানিশ রিফিউজি কাউন্সিলের পরিচালক সেলিন মিয়াস আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, দ্রুত নিষ্পত্তির চক্করে পড়ে অনেক সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যাঁদের সত্যিই সুরক্ষা প্রয়োজন, তাঁরা অবিচারের শিকার হতে পারেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ফরাসি আইনপ্রণেতা মেলিসা কামারা মনে করেন, এই নীতি ইইউ সীমান্তের বাইরে নজরদারিবিহীন অমানবিক আচরণের পথ খুলে দিচ্ছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ থেকে যারা উন্নত জীবনের আশায় বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের অজুহাতে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য পথটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে অবৈধ পথে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে ইউরোপে থাকার কোনো আইনি সুযোগ আর অবশিষ্ট থাকছে না বললেই চলে।

এখন কেবল ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষা। এটি কার্যকর হলে ২০২৬ সালের মধ্যে ইউরোপের অভিবাসন মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version