ইউরোপের অভিবাসন সংকট এখন আর কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই, তা পৌঁছে গেছে কূটনৈতিক পাড়ায়। সম্প্রতি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে পোলিশ কনসুলেটে এক নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভবনের প্রবেশপথে লাল কালি ছিটিয়ে এবং দেওয়ালে “হত্যাকারী” লিখে পোল্যান্ডের কঠোর অভিবাসন নীতির প্রতিবাদ জানিয়েছে একদল মুখোশধারী দুষ্কৃতকারী। তবে এই হামলা পোল্যান্ডকে পিছু হঠাতে তো পারেইনি, বরং ওয়ারশ একে তাদের নীতির সফলতা হিসেবে বর্ণনা করছে।
২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর সকালে ব্রাসেলসের এটারবিক ডিস্ট্রিক্টে অবস্থিত পোলিশ কনসুলেটে এই ভাঙচুর চালানো হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, তিন-চারজন মুখোশধারী ব্যক্তি ভবনের পোলিশ জাতীয় প্রতীকে আঘাত করছে এবং দেওয়ালে আপত্তিকর স্লোগান লিখছে। তারা মূলত পোল্যান্ড-বেলারুশ সীমান্তে নির্মিত বিশাল প্রতিরক্ষা প্রাচীর এবং পোল্যান্ডের নতুন ‘রাজনৈতিক আশ্রয় আইন’-এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছিল।
পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন, সীমান্তে আমাদের দেওয়ালটি কারও কারও পছন্দ হচ্ছে না। তার মানে আমাদের অভিবাসন নীতি কার্যকর হচ্ছে।
পোল্যান্ড সরকার কেন এই হামলার মুখেও অনড়, তার পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কারণ। ২০২৫ সালের শুরু থেকেই পোল্যান্ড সরকার বেলারুশ সীমান্তে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত করার আইন কার্যকর করেছে। পোল্যান্ডের দাবি, রাশিয়া ও বেলারুশ অভিবাসীদের ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে ইউরোপে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক (অক্টোবর ২০২৫) ইইউ সম্মেলনে পোল্যান্ড একটি বড় জয় পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক নিশ্চিত করেছেন যে, পোল্যান্ডকে ইইউ-এর ‘বাধ্যতামূলক অভিবাসী পুনর্বাসন’ নীতি থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। পোল্যান্ড যুক্তি দিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে কয়েক মিলিয়ন ইউক্রেনীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, তাই নতুন করে অভিবাসী নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো পোল্যান্ডের এই কঠোর অবস্থানকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বললেও, পোলিশ সরকার একে “জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা” হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়া কোনো অধিকার নয়, বরং অপরাধ।
এই হামলার ঘটনাটি পোল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডোনাল্ড টাস্কের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। সাধারণ পোলিশ নাগরিকদের বড় অংশ মনে করছে, ব্রাসেলসে বসে যারা হামলা চালাচ্ছে, তারা পোল্যান্ডের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। ফলে সরকারের কঠোর অবস্থান জনসমর্থন পাচ্ছে।
পোল্যান্ড বর্তমানে ইউরোপের সীমান্ত রক্ষার “মডেল” হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছে। কনসুলেটের দেওয়ালে ছোড়া লাল কালিকে তারা এখন আর কলঙ্ক হিসেবে নয়, বরং সীমানা রক্ষার লড়াইয়ে তাদের ‘সঠিক পথের প্রমাণ’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করছে।
