শনিবার, ২৭ই জুন, ২০২৬   |   ১৩ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জলবায়ু পরিবর্তনের চরম আঘাতে গ্রীষ্মের শুরুতেই এক নজিরবিহীন নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে পুরো ইউরোপ। তীব্র ও রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালিসহ বেশ কয়েকটি দেশ; যেখানে তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। তীব্র এই দাবদাহ কেবল জনজীবনকেই অচল করেনি, কেড়ে নিয়েছে শত শত প্রাণ।

বিবিসি নিউজের তথ্যানুসারে, এবারের গরমে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ফ্রান্সে। দেশটিতে গরম থেকে বাঁচতে নদী ও খালে নেমে এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪০ জন। অন্যদিকে, জার্মানিতেও পানিতে ডুবে প্রাণহানি ঘটেছে ছয়জনের। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ফ্রান্সের অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় ‘রেড অ্যালার্ট’ বা সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের সুরক্ষায় আগাম বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বখ্যাত আইফেল টাওয়ার ও লুভ্‌ জাদুঘর। এমনকি নদীগর্ভের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় দেশটির কয়েকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রও বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

তাপপ্রবাহের এই রেশ থেকে বাদ যায়নি পর্তুগালও। লিসবন, আলেন্তেজো এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ অঞ্চলগুলোতে তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোয় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তীব্র এই গরমে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষক সংগঠনগুলো পর্তুগাল সরকারের কাছে অবিলম্বে ক্লাস স্থগিত করার এবং জাতীয় পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছেন। পাশেই নেদারল্যান্ডস ইতিমধ্যে ‘কোড অরেঞ্জ’ বা বিপজ্জনক আবহাওয়ার সতর্কতা জারি করেছে এবং বেলজিয়াম তাদের জাতীয় ওজোন ও তাপ পরিকল্পনা সক্রিয় করেছে।

এদিকে স্পেনের কর্ডোবা ও আন্দালুসিয়ায় তাপমাত্রা ৪৪ থেকে ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গত ২৫ বছরের তুলনায় স্পেনে গ্রীষ্মের শুরুতেই এমন চরম তাপপ্রবাহ এখন একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইতালির রোম, মিলান ও ভেনিসসহ ১৫টি প্রধান শহরে জারি রয়েছে সর্বোচ্চ লাল সতর্কতা, যা সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

তবে এই চরম সংকট মোকাবিলায় ইতালি সরকার এক অনন্য ও মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। খোলা আকাশের নিচে কাজ করা কৃষি ও নির্মাণ শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় দুপুরের তীব্র গরমে কাজ পুরোপুরি স্থগিত রাখার জরুরি অধ্যাদেশ জারি করেছে তারা। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই বাধ্যতামূলক কর্মবিরতির সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিশেষ রাষ্ট্রীয় ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালি সরকার।

গত বছরই ইউরোপ জুড়ে ১০ লক্ষ হেক্টরেরও বেশি বনাঞ্চল বিধ্বংসী দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই চলমান তাপপ্রবাহের ধাক্কা খুব দ্রুত ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে- যা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে যে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট এখন কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি 

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version