জীবনযাত্রার ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়া, আবাসন সংকট, কম মজুরি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সব মিলিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভে নেমেছেন তরুণেরা। প্রচলিত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও তাঁদের আস্থা কমছে। গত সপ্তাহান্তে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন, ইতালি ও জার্মানিতে লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পেছনে রয়েছে এসব অভিন্ন অসন্তোষ।
বিক্ষোভে সামনের সারিতে রয়েছেন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। স্থানীয় নানা ইস্যু এসব আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করলেও ইউরোপজুড়ে তরুণদের অসন্তোষের মূল কারণ অনেকটাই এক।সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
সামনের সারিতে শিক্ষার্থীরা
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ফ্রান্সের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। উন্নত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্বচ্ছ পদ্ধতি বন্ধের দাবিতে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ধীরে ধীরে বড় আন্দোলনে রূপ নেয়।
সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসবিদ সিলভাঁ বুলুক বলেন, ‘এটি একটি ইউরোপীয় আন্দোলন। তবে ফ্রান্সই এর অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।’
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সমাবেশের পর গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে অন্তত ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শুরুতে এসব বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বিক্ষোভের মূল দাবিগুলো অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়।
এর চার দিন পর গ্রিসের কয়েকটি শহরে ১০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাঁদের কারও কারও হাতে ছিল গ্রিক ও ফরাসি ভাষায় লেখা স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড।
গ্রিসের অ্যারিস্টটল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ফিলিপ্পোস আর্মেন বলেন, ‘ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সমস্যাগুলো একই রকম।
চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইউরোপের অনেক তরুণের কাছে প্রচলিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এখন আর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। বেলজিয়ামের সমাজবিজ্ঞানী জিওফ্রে প্লেয়ার্সের মতে, তরুণদের সামনে বড়জোর একটি চাকরির সুযোগ রাখা হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে সেই চাকরিও অনিশ্চিত।
ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব লুভাঁর সামাজিক আন্দোলনবিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ বলেন, উচ্চ আবাসন ব্যয় ও জলবায়ু সংকটের কারণে তরুণদের পড়াশোনা শেষ করেও মা-বাবার প্রজন্মের মতো স্থিতিশীল জীবন গড়ার নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মারিয়াম মার্তিনেস-বাসকুনানের মতে, ‘দারিদ্র্যের চেয়ে অনিশ্চয়তাই মানুষের অসন্তোষের বড় কারণ।’
স্পেনের টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভিইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাদ্রিদের অটোনমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, ফ্রান্সের বিক্ষোভ অন্য দেশের তরুণদেরও আন্দোলনে উৎসাহিত করেছে। একইভাবে পর্তুগালে আবাসনের অধিকারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের তাঁবু খাটিয়ে অবস্থানের দৃশ্যও ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিক্ষোভকারীদের অনুপ্রাণিত করেছে।
আবাসন সংকটে দিশেহারা তরুণেরা
স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসের মতো দেশগুলোতে আবাসন সংকট বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম বেড়ে যাওয়ায় তরুণদের পক্ষে স্বাধীনভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
গবেষক জিওফ্রে প্লেয়ার্সের মতে, আবাসন সংকটের সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সম্পদের ক্রমবর্ধমান অসম বণ্টনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেলেও নিজেদের বাড়ি কেনা বা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
নিজেদের ‘বলির পাঁঠা’ মনে করছেন তরুণেরা
ইতিহাসবিদ সিলভাঁ বুলুকের মতে, আগের প্রজন্মের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা ও পরিবেশগত সমস্যার চাপ সম্পর্কে তরুণেরা এখন অনেক বেশি সচেতন। এ কারণে তাঁদের মধ্যে নিজেদের ‘বলির পাঁঠা’ মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
বুলুক নিজেও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তাঁর মতে, ফ্রান্সের বিদ্যালয়গুলোতে মুঠোফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার একটি অপ্রত্যাশিত প্রভাব পড়েছে। শিক্ষার্থীরা আবার একে অপরের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশের সমস্যাগুলো নিয়েও তারা সচেতন হচ্ছে।
জার্মানিতেও তরুণদের অসন্তোষের পেছনে রয়েছে ভিন্ন একটি কারণ। রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে দেশটিতে আবার বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালুর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়টি অনেক তরুণকে বিক্ষোভে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছে।
বৈষম্য ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা
আগামী এক বছরে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও গ্রিসে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এরই মধ্যে তরুণদের বিক্ষোভ সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে ২০১৮-১৯ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের কর্মীরা। ইতালিতে শুক্রবারের বিক্ষোভে তরুণদের পাশাপাশি যোগ দেন জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের প্রতিবাদ জানানো চালক ও কৃষকেরা।
গবেষক জিওফ্রে প্লেয়ার্সের মতে, ইউরোপজুড়ে মানুষের মধ্যে একটি অভিন্ন ধারণা তৈরি হয়েছে—তাঁদের কথা কেউ শুনছে না। এর ফলে সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজে বৈষম্য ও অবিচার বেড়ে যাওয়ার অনুভূতি।
প্লেয়ার্স বলেন, ‘যেসব তরুণের মা-বাবা সচ্ছল, তাঁদের জীবন তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ। বিপরীতে, যাঁরা আর্থিকভাবে অনিশ্চিত অবস্থার পরিবার থেকে এসেছেন, তাঁদের জীবন এখন অনেক বেশি কঠিন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও বৈষম্যের মতো সমস্যাগুলো ইউরোপের তরুণদের মধ্যে একধরনের অভিন্ন ক্ষোভ তৈরি করেছে। স্থানীয় ইস্যুতে শুরু হওয়া বিক্ষোভগুলোও তাই দ্রুত সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশগুলোর তরুণদের আন্দোলনে প্রভাব ফেলছে।
