মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়া থেকে জেট ফুয়েল (উড়োজাহাজের জ্বালানি) আমদানি বৃদ্ধি এবং নিজেদের শোধনাগারগুলোর উৎপাদন বাড়িয়েও স্বস্তিতে নেই ইউরোপের দেশগুলো। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এই সম্ভাব্য সংকটে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল ইউরোপ মহাদেশ।
কয়েক দশক ধরে একের পর এক নিজেদের তেল শোধনাগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপের দেশগুলো উড়োজাহাজের জ্বালানির জন্য মূলত হরমুজ প্রণালী হয়ে আসা মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই সংকটে মহাদেশটির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি।
ফেব্রুয়ারির শেষে ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের জ্বালানি চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গত জুনে তা আংশিক চালু হলেও, চলতি জুলাইয়ে এসে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলায় সেই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
জ্বালানি বিষয়ক আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই তৃতীয় প্রান্তিকে ইউরোপে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ব্যারেল জেট ফুয়েলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিপরীতে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ১৬ হাজার ব্যারেল এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ৪ লাখ ২৫ হাজার ব্যারেল জ্বালানি উদ্বৃত্ত থাকবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জুনের শুরুতে ইউরোপের মোট মজুত ছিল মাত্র ৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল, যা দিয়ে তাদের ৩০ দিনের চাহিদাও মেটানো সম্ভব নয়। প্রধান জেট ফুয়েল বাজারগুলোর মধ্যে ইউরোপেরই মজুত এখন বিশ্বে সবচেয়ে কম। ইউরোপীয় কমিশনের জ্বালানি বিষয়ক কমিশনার ড্যান জর্গেনসেন গত জুনে সতর্ক করেছিলেন যে গ্রীষ্মকালীন ছুটির শেষের দিকে জেট ফুয়েলের মজুত আরও কমতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজনে ইইউ জোটের দেশগুলোর জাতীয় জরুরি তহবিল থেকে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ছাড়ের বিষয়ে সমন্বয় করবে ব্রাসেলস।
বর্তমান সংঘাত শুরুর আগে ইউরোপ তাদের মোট জেট ফুয়েল আমদানির অর্ধেকই আনত মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তবে বর্তমান সরবরাহ ঝুঁকি এড়াতে মহাদেশটি এখন কানাডা ও নাইজেরিয়ার মতো নতুন বিক্রেতাদের দিকে ঝুঁকছে।
গত জুনে ইউরোপ দৈনিক রেকর্ড ৬ লাখ ৭৩ হাজার ব্যারেল জেট ফুয়েল আমদানি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে এখন নাইজেরিয়ার ডাঙ্গোটে শোধনাগার, কুয়েত, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও জ্বালানি আনা হচ্ছে। এমনকি অভ্যন্তরীণ জোগান বাড়াতে ইতালির শোধনাগারগুলোও তাদের উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়িয়েছে।
উত্তেজনা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে জেট ফুয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে গত মার্চের রেকর্ড ২১৫.৩২ ডলার থেকে কমে বর্তমানে ১৩৩.২৭ ডলারে নেমে এসেছে, যা বিমান সংস্থাগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তির। সাধারণত একটি এয়ারলাইন্সের পরিচালন ব্যয়ের ২০ থেকে ২৫ শতাংশই যায় জ্বালানি খাতে। তবে জ্বালানির দাম কমলেও সাধারণ যাত্রীদের জন্য সুখবর নেই। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে জ্বালানির তীব্র চাহিদা এবং বিশ্বজুড়ে উড্ডয়ন সক্ষমতা সীমিত থাকায় বিমান টিকিটের মূল্য এখনই কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিপেনডেন্ট
