ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টুব ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরের সঙ্গে ফোনালাপে প্রায় ৯০ মিনিট ধরে মধ্যযুগের স্লাভ জাতির ইতিহাস নিয়ে কথা বলেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এই ফোনালাপের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এতে যুদ্ধবিরতি নিয়ে অর্থবহ আলোচনা খুব একটা হয়নি বলে জানা গেছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বরাতে দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফোনালাপটি আধা ঘণ্টা চলার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা দেড় ঘণ্টা ধরে চলে। কথোপকথন সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের ভাষ্য, আলোচনার বেশির ভাগ সময় পুতিন মধ্যযুগের স্লাভ জাতির ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দেন। এতে ইউক্রেন যুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি রাশিয়ার অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
দীর্ঘ এই আলোচনায় তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির বিষয়ে তেমন অগ্রগতি হয়নি। অথচ নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু হলে ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান দাবি হতে পারে যুদ্ধবিরতি। চার বছর আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে রাশিয়া কতটা আন্তরিক, তা নিয়েও এ ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পুতিনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার উদ্যোগ নিয়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশের নেতারা সমালোচনা করেছেন। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ইউরোপের অনেক দেশের কাছে পুতিনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের এই উদ্যোগ নিয়ে তিনি সন্দিহান। তাঁর মতে, ইউরোপের উচিত আলাদাভাবে উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ থাকা। অন্যদিকে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন জানান, তাঁকে এবং ইউরোপের অন্য নেতাদের এই ফোনালাপের বিষয়ে আগে থেকে জানানো হয়নি।
তবে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, ফোনালাপটি তাঁদের সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই করা হয়েছিল। পুতিনের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগকে তিনি ‘সঠিক পদ্ধতি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ফোনালাপের বিষয়ে ক্রেমলিনের বিবৃতিতে বলা হয়, পুতিন রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তা জোটের সম্পর্ক এবং ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণকে যুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার আইনি স্বার্থ সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে বিবেচনায় নেওয়া হলেই কেবল দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
এর আগে গত আগস্টে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ বৈঠকেও ইতিহাসের প্রসঙ্গ প্রাধান্য পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের দ্রুত অবসানের আশায় ওই বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন ট্রাম্প। এর আগে নির্বাচনী প্রচারে তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
কিন্তু বৈঠকে পুতিনের দীর্ঘ ঐতিহাসিক বয়ান শুনতে হয় ট্রাম্পকে। এতে মধ্যযুগের রুশ শাসক নভগোরদের রুরিক ও ইয়ারোস্লাভ দ্য ওয়াইজের পাশাপাশি ১৭ শতকের কসাক নেতা বোহদান খমেলনিতস্কির প্রসঙ্গও উঠে আসে। দ্য আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিনের বক্তব্যে বিরক্ত হয়ে ট্রাম্প বৈঠক ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
পুতিনের ঐতিহাসিক বয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইউক্রেনকে রাশিয়ার ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরা। এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে ইউক্রেনের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করা হয় বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে একই ধরনের দীর্ঘ ঐতিহাসিক বক্তব্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
এদিকে ক্রেমলিন বুধবার জানিয়েছে, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনায় ইউরোপের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন না। ক্রেমলিনের কর্মকর্তা ইউরি উশাকভ বলেন, স্টুব ও স্টোরের সঙ্গে পুতিনের ফোনালাপে আলোচনায় ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো কথা হয়নি।


