ইউরোপীয় কমিশন পর্তুগালের আবাসন সংকটকে ইউরোপজুড়ে সামাজিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে কমিশন জানিয়েছে, পর্তুগালে ক্রমবর্ধমান বাড়িভাড়া, আবাসন ব্যয় ও সীমিত সরবরাহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠোর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আবাসন ব্যয়ের চাপ
ইউরোপীয় সেমিস্টারের শরৎ প্যাকেজের অংশ হিসেবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে পর্তুগালের ৬ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ তাদের আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ (অতিরিক্ত বোঝা) আবাসনের খরচ হিসেবে ব্যয় করতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও এই হার ইইউ গড় ৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কিছুটা কম, তবে বৃদ্ধির হার ছিল ইউরোপে অন্যতম সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি।
কমিশন বলছে, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক এবং নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন আছে, কারণ গত কয়েক বছরে পর্তুগালে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। দেশটি বর্তমানে ইইউর সেই কয়েকটি রাষ্ট্রের মধ্যে অন্যতম, যেখানে বার্ষিক ১০ শতাংশ বা তারও বেশি বাড়ির দাম বৃদ্ধি নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটননির্ভর শহরগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও স্থানীয় সরবরাহ ঘাটতি এই সংকটকে আরও গভীর করছে।
ইইউর সাশ্রয়ী আবাসন পরিকল্পনা
আবাসন সংকট মোকাবিলায় ইউরোপীয় কমিশন আগামী ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ একটি ইউরোপীয় সাশ্রয়ী আবাসন পরিকল্পনা (European Affordable Housing Plan) প্রকাশ করতে যাচ্ছে। পরিকল্পনাটি জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের আবাসন নীতিকে পরিপূরক করবে, যদিও আবাসন নীতি মূলত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব এখতিয়ার।
নতুন প্যাকেজে থাকছে, সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, রাষ্ট্রীয় সহায়তার (State Aid) নিয়ম সংশোধন, নতুন ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি সৃজনশীল ও টেকসই উন্নয়ন (European Bauhaus) কর্মসূচি, আবাসন নির্মাণে টেকসই কৌশল এবং স্বল্পমেয়াদি ভাড়া প্ল্যাটফর্ম -Airbnb নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতা।
বিশেষত পর্যটন এলাকাগুলোতে স্বল্পমেয়াদি ভাড়া প্ল্যাটফর্ম (Airbnb)-এর মতো স্বল্পমেয়াদি ভাড়ার প্রসার স্থানীয় বাসিন্দাদের আবাসন পাওয়া কঠিন করে তুলেছে বলেও প্রতিবেদনটিতে আরও উঠেছে।
ইউরোপজুড়ে সংকট
পুরো ইউরোপজুড়েই আবাসন সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইইউর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছরের প্রতি চারজনের একজন জনাকীর্ণ বাসস্থানে বসবাস করে। অধিকাংশ তরুণ ৩০ বছরের কাছাকাছি বা পরে বাবা-মায়ের বাড়ি থেকে আলাদা হচ্ছে। ২০২৩ সালে ইউরোপের ১০ শতাংশ মানুষ তাদের আয়ের ৪০ শতাংশ বা তার বেশি কেবল বাড়িভাড়ায় ব্যয় করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইউরোপের শ্রমবাজার, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর স্বাধীন জীবনযাত্রায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক দেশেই সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণে পিছিয়ে পড়া, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ-চালিত আবাসন বাজার সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ
পর্তুগালের বৃহৎ শহরগুলো বিশেষ করে লিসবন, পোর্তো এবং পর্যটন এলাকা আলগারভ, আবাসন সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদেশি বিনিয়োগকারী, গোল্ডেন ভিসা প্রোগ্রাম, স্বল্পমেয়াদি ভাড়া এবং সীমিত নতুন নির্মাণ বাজারকে অসম অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন বলছে, যদি এখনই শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আবাসন সংকট পর্তুগালের অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো এবং নাগরিকদের জীবনমানকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
