শিক্ষার্থীদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন এবং পারস্পরিক মেলামেশা বাড়ার প্রমাণ পাওয়ার পর স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করছে পর্তুগাল সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণির পাশাপাশি এখন সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যও স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে।
বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত এ সিদ্ধান্তের ফলে শিক্ষার্থী আইন (স্টুডেন্ট স্ট্যাটিউট) সংশোধন করা হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রথম টার্মে স্কুলগুলোকে নিজস্ব নীতিমালা হালনাগাদের সময় দেওয়া হবে। এরপর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ, অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। তবে মাধ্যমিকের ঊর্ধ্বতন স্তরের শিক্ষার্থীরা আগের মতোই এর বাইরে থাকবে।
শিক্ষামন্ত্রী ফার্নান্দো আলেক্সান্দ্রে বলেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং ইতোমধ্যে নিজ উদ্যোগে এ ধরনের বিধিনিষেধ চালু করা স্কুলগুলোর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শিশু ও কিশোরদের বিকাশে স্মার্টফোনের ক্ষতিকর প্রভাব এখন স্পষ্ট এবং বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত।’ তাঁর ভাষ্য, এই নীতির লক্ষ্য হলো শেখার জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং শিক্ষার্থীদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা।
সরকারের পরিকল্পনা ও জননীতি মূল্যায়ন কেন্দ্র-এর তথ্য অনুযায়ী, যেসব স্কুলে স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সামাজিক যোগাযোগ ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনাও কমেছে।
স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাইবার বুলিংয়ের ঘটনাও কমেছে। বিরতির সময় শিক্ষার্থীরা এখন বেশি কথা বলছে, খেলাধুলা করছে এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে।
ফার্নান্দো আলেক্সান্দ্রে বলেন, শিশু-কিশোরদের স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ক্ষেত্রে পর্তুগাল আন্তর্জাতিক প্রবণতাই অনুসরণ করছে।
তিনি বলেন, ‘স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ এগুলো আসক্তিমূলক আচরণ তৈরি করে, যা মানুষের স্বাধীনতাকে সীমিত করে।’
তবে তিনি স্বীকার করেন, যেসব স্কুলে সপ্তম-নবম শ্রেণির পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরাও পড়ে, সেখানে এ নিয়ম কার্যকর করা কিছুটা কঠিন হতে পারে। কারণ বড় শিক্ষার্থীরা তখনও ফোন ব্যবহার করতে পারবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, শুধু স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করলেই অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সব সমস্যা সমাধান হবে না। এ জন্য সরকার স্কুলে ১ হাজার ৪০৬ জন বিশেষজ্ঞ কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে, যাদের প্রায় অর্ধেকই মনোবিজ্ঞানী। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আরও বেশি মেলামেশায় উৎসাহিত করতে স্কুলের খোলা জায়গাগুলো উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা অভিভাবকদের
অন্যদিকে, দেশটির অভিভাবকদের জাতীয় সংগঠন কনফেডারেশন অব পেরেন্টস অ্যাসোসিয়েশনস-এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির মতে, স্কুলে স্মার্টফোন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বদলে শিশুদের দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো উচিত।
সংগঠনের সভাপতি মারিয়ানা কারভালহো রেনাসেন্সা রেডিওকে বলেন, ‘দ্বিতীয় ধাপে (ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত) নিষেধাজ্ঞার সঙ্গেও আমরা একমত ছিলাম না, আর এই সম্প্রসারণের সঙ্গেও একমত নই।’
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের একে অপরের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে উৎসাহিত করার উদ্যোগকে তারা সমর্থন করেন। তবে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট নিয়ম-কানুন প্রণয়নই হওয়া উচিত।
কারভালহোর মতে, যেকোনো বিধিনিষেধের সফলতা নির্ভর করে পুরো শিক্ষাসমাজের অংশগ্রহণের ওপর।
তিনি বলেন, ‘স্কুলে সামাজিক যোগাযোগ ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিক্ষা-সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শুধু নিষেধাজ্ঞা কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও আনতে পারে; বরং অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শাস্তিমূলক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’
তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, স্কুলে ফোন ব্যবহার করতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী বাড়ি ফিরে অতিরিক্ত সময় স্মার্টফোনে কাটিয়ে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করবে।
কারভালহো বলেন, ‘এতে পারিবারিক সময়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে অতিরিক্ত সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করতে চাইবে।’ তাঁর ভাষ্য, অনেক তরুণ-তরুণী খবরাখবর জানা, যোগাযোগ রাখা এবং গেম খেলার জন্যও স্মার্টফোন ব্যবহার করে।
