স্পেনের ছিটমহল সেউতায় মরক্কো সীমান্ত দিয়ে ৬০ হাজারের বেশি অভিবাসীর অনুপ্রবেশের ঘটনায় ইসরায়েলের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির একজন মন্ত্রী।
গত শুক্রবার জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘ইসরায়েলকে উপদেশ দেওয়ার কোনো সুযোগই স্পেন হাতছাড়া করে না। অথচ নিজেদের অভিবাসন সংকটের কারণে সেউতায় এখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে।’
তিনি আরও লিখেন, ‘ইসরায়েলকে উপদেশ দেওয়ার আগে স্পেনের উচিত, আফ্রিকায় তারা এখনো কেন ঔপনিবেশিক ছিটমহল ধরে রেখেছে, সেটির ব্যাখ্যা বিশ্বের কাছে দেওয়া।’
ড্যাননের এই বিতর্কিত পোস্টটি শেয়ার করে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে মন্তব্য করেন, ‘আচ্ছা, তাহলে বিষয়টি বেশ পরিষ্কারই হয়ে যাচ্ছে।’
এদিকে স্পেনের বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক দাবি করেছেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করায় মূলত মাদ্রিদ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে এই অভিবাসী সংকটকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
দেশটির বামপন্থী দল ‘রিপাবলিকান লেফট অব কাতালোনিয়া’র সংসদীয় মুখপাত্র গ্যাব্রিয়েল রুফিয়ান বলেছেন, এই সংকট মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থই পূরণ করছে।
স্প্যানিশ সাংবাদিক হোসে ভিজনার ২০১৯ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুর একটি পুরোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টও সামনে এনেছেন। যেখানে সেউতায় বিচ্ছিন্নতাবাদের পেছনে ইসরায়েলের গোপন সমর্থন থাকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল।
স্পেনের জনপ্রিয় অস্কারজয়ী অভিনেতা হাভিয়ের বারদেমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন, যেখানে সেউতায় অভিবাসীদের এই অস্বাভাবিক ঢলের পেছনে সরাসরি ইসরায়েলের হাত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
পর্তুগালের সাবেক মন্ত্রী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্রুনো মাকাইস বলেন, ‘ঘটনার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জড়িত ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে ঘটনার পর তারা অত্যন্ত সক্রিয় ছিল এবং বিশেষ করে বর্তমান স্প্যানিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিষয়টি ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে।’
সেউতা এবং মেলিলা মরক্কোর উপকূলে অবস্থিত স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। এগুলোই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকার মধ্যে একমাত্র স্থলসীমান্ত। স্পেন সরকারের অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছে, যার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার শিশু রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অনেক অভিবাসী সাঁতরে সীমান্ত অতিক্রম করছেন। কেউ কেউ সুইমিং ড্রেস পরে এবং ভাসমান টিউব বা রিং ব্যবহার করে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করেছেন।
অভিবাসীদের এই ঢলকে কেন্দ্র করে ইউরোপজুড়ে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা স্পেন সীমান্তে নিরাপত্তা নজরদারি আরও জোরদার করছে। অন্যদিকে ইতালি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, প্রয়োজন হলে স্পেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্মুক্ত সীমান্তব্যবস্থা ‘শেনজেন অঞ্চল’ থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করার দাবি তোলা হতে পারে।
অবশ্য গত শনিবার স্পেন সরকার জানায়, প্রায় ৪৮ হাজার অভিবাসী ইতিমধ্যে স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, অনেক অভিবাসী সেউতার সুড়ঙ্গে আশ্রয় নিচ্ছেন, আবার অনেকে শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ পর্যন্ত সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন একযোগে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেছেন, তা এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। তবে অতীতেও এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালের মে মাসে বিতর্কিত পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধের জেরে প্রায় ৮ হাজার মরক্কোর নাগরিক সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন। তখন স্পেন অভিযোগ তুলেছিল যে, মরক্কো অভিবাসীদের কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যদিও মরক্কোর এক মন্ত্রী বলেছিলেন, কূটনৈতিক বিরোধের জবাব হিসেবে তাদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা সম্পূর্ণ জুক্তিক ছিল।
এবারও কয়েকজন বিশ্লেষক অভিযোগ করেছেন যে, মরক্কো সরকার এই সীমান্ত পারাপারে নীরব সমর্থন দিয়েছে। তাঁদের মতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সম্প্রতি আলজেরিয়া সফর করায় মরক্কো ক্ষুব্ধ ছিল। মূলত আলজেরিয়াই স্পেনের সবচেয়ে বড় গ্যাস সরবরাহকারী দেশ।
বার্সেলোনার পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসনবিষয়ক গবেষক লোরেঞ্জো গ্যাব্রিয়েলি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘মরক্কোর ভূমিকা ছাড়া এক দিনে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের পক্ষে মরক্কো-স্পেন সীমান্ত অতিক্রম করা অসম্ভব।’
সেউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস এ ঘটনাকে ‘স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে স্পেনে নিযুক্ত মরক্কোর রাষ্ট্রদূত কারিমা বেনইয়াইচ বলেন, ‘আমরা সব সময় বৈধ, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ অভিবাসনকেই অগ্রাধিকার দিয়েছি।’ তিনি দাবি করেন যে, সীমান্ত পার হওয়ার এই ঘটনাগুলো মরক্কো সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সীমান্ত পরিস্থিতিকে একটি ‘বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘আমরা যদি ক্ষমতায় না থাকতাম, তাহলে আমাদের দেশেও এমনভাবে অনুপ্রবেশ হতো, এতে স্পেনের পরিস্থিতিকেও ছোট মনে হতো।’
